পর্দা নামলো বিশ্ব সিনেমার মহোৎসবের
লালগালিচার ঝলক পেরিয়ে শেষ হলো কান উৎসবের ৭৯তম আসর
দুই সপ্তাহব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন শেষে পর্দা নামল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব; ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের। ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর কান-এর ঐতিহাসিক গ্রাঁ থিয়াত্র লুমিয়ের প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী অনুষ্ঠান ঘিরে ছিলো তারকাদের সরব উপস্থিতি, দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ব্যাপক আগ্রহ।
শনিবার (২৩ মে) সন্ধ্যায় আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক, পরিবেশক ও সমালোচকেরা অংশ নেন। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিলো আবেগ, প্রত্যাশা ও উদযাপনের আবহ। উৎসব কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের আসরে বৈচিত্র্যময় গল্প, নতুন ভাষার চলচ্চিত্র এবং তরুণ নির্মাতাদের শক্তিশালী উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে।
এবারের প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নেয় ২২টি চলচ্চিত্র। জুরি বোর্ডের সভাপতিত্ব করেন দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক পার্ক চ্যান-উক। তাঁর সঙ্গে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিনেতা, পরিচালক ও লেখকেরা।
সমাপনী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত ছিলো পাম দ’অর বিজয়ীর নাম ঘোষণা। এ বছর সর্বোচ্চ সম্মাননা পাম দ’অর জিতেছে রোমানিয়ান পরিচালক ক্রিস্টিয়ান মুঙ্গিউ পরিচালিত চলচ্চিত্র ফিয়র্ড। চলচ্চিত্রটি আধুনিক সমাজের ভেতরের ফাটল, ভণ্ডামি এবং সহনশীলতার প্রশ্নকে গভীর রাজনৈতিক রূপকে তুলে ধরেছে।
পুরস্কার গ্রহণের সময় মুঙ্গিউ বলেন,
সিনেমা এখনও মানুষের গল্প বলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
তার বক্তব্যের পর দীর্ঘ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম।
এ ছাড়া গ্রাঁ প্রি, জুরি পুরস্কার, সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রী বিভাগেও বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। বিচারকদের মতে, এবারের চলচ্চিত্রগুলোতে যুদ্ধ, অভিবাসন, পরিচয় সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো সমসাময়িক বিষয় গভীরভাবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সমালোচকেরাও এবারের প্রতিযোগিতাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী লাইনআপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিলো কিংবদন্তি শিল্পী বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডকে সম্মানসূচক পাম দ’অর প্রদান। চলচ্চিত্র ও সংগীতে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে তার কর্মজীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে একটি বিশেষ ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
সম্মাননা গ্রহণের পর পাঠানো বার্তায় স্ট্রাইস্যান্ড বলেন, সিনেমা মানুষকে একত্র করে। ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করে এটি আমাদের অনুভূতিগুলোকে যুক্ত করে। তার বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেক অতিথি।
কানের সমাপনী অনুষ্ঠান মানেই বিশ্ব ফ্যাশনের অন্যতম বড় প্রদর্শনী। এবারের আসরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিভিন্ন দেশের তারকারা বৈচিত্র্যময় পোশাকে লালগালিচায় হেঁটে দর্শক ও আলোকচিত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
ভারতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের উপস্থিতি ছিলো বিশেষভাবে আলোচিত। ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক নকশার সমন্বয়ে তৈরি পোশাকে ক্যামেরার সামনে হাজির হলে মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি। পাশাপাশি হলিউড তারকা, ইউরোপীয় নির্মাতা এবং এশিয়ার উদীয়মান অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতিও দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে।
এবারের উৎসবে ইউরোপীয় আর্টহাউস সিনেমার পাশাপাশি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। আলোচনায় উঠে আসে জাপানি পরিচালক রিউসুকে হামাগুচির নতুন চলচ্চিত্র, রুশ নির্মাতা আন্দ্রেই জভিয়াগিনৎসেভের রাজনৈতিক রূপকধর্মী কাজ এবং পোলিশ পরিচালক পাভেল পাভলিকোভস্কির মানবিক গল্পভিত্তিক সিনেমা।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এবারের উৎসব বিশ্ব রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। অনেক চলচ্চিত্রে যুদ্ধোত্তর মানসিকতা, অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে মানুষের একাকিত্বকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নয়, কান উৎসবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাণিজ্যও ছিলো বেশ সক্রিয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশকেরা নতুন চলচ্চিত্রের বিপণন, আন্তর্জাতিক মুক্তি এবং যৌথ প্রযোজনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। আয়োজকদের তথ্যমতে, এবারের মার্চে দ্যু ফিল্মে শতাধিক দেশের অংশগ্রহণ ছিলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও চলচ্চিত্র শিল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যৌথ প্রযোজনার প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের সিনেমা বাজারকে আরও বৈশ্বিক করে তুলবে।
জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হলেও এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্ব সিনেমাপ্রেমীদের আলোচনায় দীর্ঘদিন স্থান করে নেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন নির্মাতাদের সাহসী গল্প, অভিজ্ঞ পরিচালকদের পরিণত নির্মাণশৈলী এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে এবারের আসরকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম স্মরণীয় উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এখন বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অপেক্ষা—কান উৎসবে আলোচিত সিনেমাগুলো কবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাগৃহ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাবে।
সবার দেশ/কেএম




























