ভালোবাসার আলিঙ্গনেই ভাঙলো স্ত্রীর ৫ পাঁজর!
অস্টিওপোরোসিসে হাড় ভঙ্গুর, হাসপাতালে নারী; সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও।
ভালোবাসার মানুষের একটি সাধারণ আলিঙ্গনও কখনও গুরুতর শারীরিক আঘাতের কারণ হতে পারে—চীনের এক দম্পতির ঘটনা সামনে আসার পর এমনই আলোচনা শুরু হয়েছে স্যোশাল মিডিয়ায়। শীত লাগছে বলায় স্ত্রীকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন স্বামী। কিন্তু সে আলিঙ্গনের পরই তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন স্ত্রী। পরে হাসপাতালে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার পাঁচটি পাঁজরের হাড় ভেঙেছে এবং আরেকটিতে চিড় ধরেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওই নারী অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘জিংসি লাইভ’-এর বরাতে জানা যায়, ওয়াং পদবির ওই ব্যক্তি স্ত্রীকে উষ্ণতা দিতে স্বাভাবিকভাবেই জড়িয়ে ধরেছিলেন। তার দাবি, আলিঙ্গনের সময় তিনি কোনও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেননি। কিন্তু ওই মুহূর্তেই হাড় ভাঙার মতো শব্দ শুনতে পান তিনি। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে স্ত্রী মাটিতে বসে পড়েন।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পড়েন দুজনই। প্রথমে আঘাতের ভয়াবহতা বুঝতে না পারায় ওই নারী সারা রাত যন্ত্রণা সহ্য করেন। পরদিন সকালে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে বুকের সিটি স্ক্যান করার পর চিকিৎসকেরা পাঁচটি পাঁজরের হাড় ভাঙা এবং ষষ্ঠ পাঁজরে চিড় ধরার বিষয়টি শনাক্ত করেন।
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় হাড় দুর্বল
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে ওয়াং জানান, তার স্ত্রীর হাড় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। এর পেছনে অস্টিওপোরোসিসের ভূমিকা রয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
ওয়াংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রীর ওজন ছিলো প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কেজি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ডায়েট করতেন এবং প্রায়ই রাতের খাবার এড়িয়ে যেতেন। পাশাপাশি তার সূর্যালোকের সংস্পর্শও ছিলো খুব সীমিত। বাড়ি থেকে মাত্র দুই-তিন মিনিটের দূরত্বে থাকা পারিবারিক দোকানেই তার বেশির ভাগ সময় কাটতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাড়ক্ষয়ের প্রকৃত কারণ জানতে তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসার ইতিহাস মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কেনো সামান্য চাপেও ভাঙতে পারে পাঁজর?
উহান এশিয়া হার্ট জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ইয়ান ইয়ানসিয়াং জানান, সুস্থ তরুণদের ক্ষেত্রে শুধু আলিঙ্গনের চাপে পাঁজরের হাড় ভেঙে যাওয়া অত্যন্ত বিরল। হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে সামান্য আঘাত বা স্বাভাবিকের তুলনায় কম চাপেও হাড় ভেঙে যেতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের ঘনত্ব ও গঠন দুর্বল হয়ে যায়। ফলে হাড় সহজে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বাড়লেও কম বয়সীদেরও বিভিন্ন কারণে হাড়ক্ষয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ডায়েট করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে শরীরকে বঞ্চিত করা, কম ওজন এবং দীর্ঘদিনের ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হাড়ের দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের নামে দীর্ঘদিন খাবার বাদ দেয়া বা ভারসাম্যহীন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা উচিত নয়।
অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা
চিকিৎসকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাঁজরের হাড় ভাঙার পর ফুসফুস বা ফুসফুসের আবরণে কোনও জটিলতা তৈরি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের জটিলতা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও বিশ্রামের মাধ্যমে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ওই নারীর ক্ষেত্রেও অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে ওষুধ, বিশেষ প্যাচ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পাঁজর ভাঙার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, তীব্র বুকব্যথা কিংবা অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে জরুরি চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন।
সচেতনতার বার্তা
স্বামীর আলিঙ্গনে স্ত্রীর পাঁচটি পাঁজর ভাঙার ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার জন্ম দিলেও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত বিষয় রয়েছে। হাড়ের দুর্বলতা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাই অস্বাভাবিকভাবে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে গেলে কিংবা হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। আর অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি থাকলে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন নয়, প্রয়োজনে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষাসহ যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সবার দেশে/এমকেজে




























