শোকাবহ স্মরণিকা
শিক্ষক ও কবি মোঃ মজিবুর রহমান: মেঘনার বাতিঘর
মেঘনার শান্ত, স্নিগ্ধ জনপদ আজ এক গভীর শূন্যতায় ভারাক্রান্ত। যে মানুষটি এ অঞ্চলের আলো-অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, যিনি কবিতার পঙক্তিতে জীবনের গভীর সত্যকে সহজ ভাষায় তুলে ধরতেন—শিক্ষক ও কবি মোঃ মজিবুর রহমান স্যার আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার চলে যাওয়া মানেই কি সত্যিই বিদায়? না, তিনি আছেন তার রেখে যাওয়া শব্দে, শিক্ষায়, আর অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের অন্তর্গত শ্রদ্ধায়।
তিনি ছিলেন কেবল একজন শিক্ষক নন; ছিলেন এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, এক নীরব বিপ্লবী, যিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষা মানে কেবল পাঠ্যবই নয়—মানুষ গড়ার নিরন্তর সাধনা। শ্রেণিকক্ষ তার কাছে ছিলো জীবনের পাঠশালা, আর শিক্ষার্থীরা ছিলো ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা। কঠোরতা ও স্নেহের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এমন এক প্রজন্ম, যারা আজও তার আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।
তার কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে জীবনের বহুমাত্রিক অনুভব। ‘মা’ কবিতায় তিনি মাতৃত্বকে দেখেছিলেন সর্বোচ্চ আশ্রয় ও পবিত্র ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে। তার বিশ্বাস ছিলো, যে হৃদয় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সে হৃদয় কখনোই অন্ধকারে হারিয়ে যায় না। এ কবিতা তাই কেবল সাহিত্য নয়, এক নৈতিক শিক্ষার দিশারিও।
‘বাংলা আমার’ কবিতায় ফুটে উঠেছে তার গভীর দেশপ্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ বাংলার মাটি কেবল ভৌগোলিক পরিচয় নয়, এটি আত্মার পরিচয়। গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি মানুষের হাসি-কান্না তার কাছে ছিলো অমূল্য সম্পদ। সমাজসেবায় তার নিবেদন ছিলো এ বিশ্বাসেরই বাস্তব রূপ—দেশকে ভালোবাসা মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
‘ফাগুনের গান’ কবিতায় তিনি জীবনের ক্লান্তি ভেঙে নতুন আশার কথা বলেছেন। শীতের নিষ্প্রাণতা কাটিয়ে ফাগুনের আগমনের মতোই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তার জীবনদর্শন ছিলো—অন্ধকার যতই ঘন হোক, আশার আলো কখনও নিভে যায় না।
অন্যদিকে ‘নজরুলের জন্মদিনে’ কবিতায় তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেতনাকে ধারণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ন্যায়, মানবতা ও সাহসিকতার যে বাণী তিনি উচ্চারণ করেছেন, তা তার শিক্ষাদর্শনেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন—মেরুদণ্ডহীন শিক্ষা কোনও সমাজ গড়তে পারে না।
আরও পড়ুন <<>> শিক্ষক স্মৃতি: আলোকিত মানুষ মোঃ আবদুস ছোবহান
একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন কঠোর নিয়মানুবর্তী, তেমনি সমাজসেবী হিসেবে ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ। মেঘনার মানুষ তাকে দেখেছে বিপদের সময় প্রথম সারিতে দাঁড়াতে, নিঃস্বার্থভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। তার জীবন ছিলো শব্দহীন এক কর্মযজ্ঞ, যেখানে প্রতিটি কাজই ছিলো মানবতার পক্ষে এক নীরব ঘোষণা।
আজ তার শারীরিক অনুপস্থিতি আমাদের বেদনায় ভারী করে তুললেও, তিনি আছেন তার কর্মে, তার কবিতায়, তার গড়ে তোলা মানুষের মাঝে। সময়ের প্রবাহ তাকে মুছে ফেলতে পারবে না, বরং আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
হে প্রিয় শিক্ষক, আপনার শেখানো প্রতিটি পাঠ, প্রতিটি নীতি আজও আমাদের পথ দেখায়। আপনার কবিতার প্রতিটি শব্দ আজও আমাদের অন্তরে অনুরণিত হয়। আপনি শারীরিকভাবে দূরে হলেও, মেঘনার প্রতিটি হৃদয়ে আপনি চিরজীবী।
আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আপনার আলোয় আলোকিত এ পথচলা থামবে না—এটাই আপনার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক ও সংবাদকর্মী





















