সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ
দেশ-বিদেশে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের প্রস্তুতি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও বৈপ্লবিক চেতনাকে দেশ-বিদেশে নতুনভাবে তুলে ধরতে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কমিটির এক উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সভায় ‘নজরুল বর্ষ’ (২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭) উদযাপন উপলক্ষে দেশব্যাপী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা কর্মসূচির অগ্রগতি ও প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় জানানো হয়, দেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটি জেলা প্রশাসনের জন্য আড়াই লাখ টাকা এবং ৭৪টি প্রত্যন্ত উপজেলার প্রতিটির জন্য দেড় লাখ টাকা করে মোট ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী তিন দিনব্যাপী বিশেষ উদ্বোধনী কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তুতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
সভায় সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অতীতে পরিকল্পিতভাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আড়ালে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলো। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের মানুষের মনন ও স্মৃতি থেকে নজরুলকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছিলো। তবে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে নতুন সাংস্কৃতিক জাগরণ শুরু হয়েছে এবং সে নতুন যুগে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণার নাম নজরুল।
বিশ্বব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’কে তুলে ধরতে সভায় আন্তর্জাতিক মানের প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এসব নির্মাণকাজ বিশ্বখ্যাত ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজনে প্রচারের উপযোগী করে তৈরি করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে ‘Land of Nazrul’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার প্রস্তাব আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যুক্তরাজ্যের ‘Land of Shakespeare’ পরিচিতির মতো এ উদ্যোগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
সাংস্কৃতিক কূটনীতি জোরদারের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কালচারাল ডিপ্লোম্যাসি উইংয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও বৈপ্লবিক চেতনা বাংলাদেশের ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে তুলে ধরার প্রস্তাব করা হয়। একইসঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি আয়োজন এবং বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে বিতরণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের তথ্যবহুল বুকলেট প্রকাশের পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে।
সভায় নজরুলের আন্তর্জাতিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে তুরস্কে বিশেষ প্রচারণা চালানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। পাশাপাশি তার সাহিত্য ও গবেষণামূলক কর্ম বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষায় অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় আগামী জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বৃহৎ পরিসরে ‘নজরুল মেলা’ আয়োজন, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা নজরুল গবেষকদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং দেশজুড়ে নজরুলের জীবন ও সাহিত্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রস্তাবও উঠে আসে। এছাড়া কবির নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ রচনাবলি নিয়ে বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশের পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়।
তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে দেশব্যাপী ‘নজরুল ট্যালেন্ট হান্ট’, ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতা এবং কবির একটি প্রামাণ্য ও প্রমিত জীবনী প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা নজরুলের প্রকাশনা ও সাহিত্যকর্মকে কেন্দ্র করে বিশেষ বইমেলার আয়োজনের প্রস্তাব দেন। এছাড়া মাসভিত্তিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী মুক্তিতে নজরুলের অবদান নিয়ে গবেষণা, ডিসেম্বর মাসে দেশাত্মবোধক নজরুল সংগীতের বৃহৎ আয়োজন এবং পবিত্র রমজানে নজরুলের হামদ-নাত নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের রূপরেখাও সভায় উপস্থাপন করা হয়।
সভায় সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলি নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলাসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকবৃন্দ এবং দেশের বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও জাতীয় কমিটির সদস্যরাও সভায় অংশ নেন।
সভায় উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























