ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, ফ্রান্সে প্রাণহানি ছাড়ালো ৪ হাজার
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ফ্রান্সে অতিরিক্ত গরমে প্রাণহানির সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়েছে। শুধু গত সপ্তাহের চরম তাপপ্রবাহের সময়ই দেশটিতে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা।
রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে সেদিনই ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। পরবর্তী দুই দিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়ে যায়।
অথচ চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ফ্রান্সে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতো। সে তুলনায় গত সপ্তাহের মৃত্যুর হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মাত্র তিন দিনেই অন্তত ১ হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে বাড়িতে মৃত্যুসহ সব তথ্য সংগ্রহ শেষ হলে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। নিহতদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ছিলো ৬৫ বছর বা তার বেশি।
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের যেসব অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি ছিলো। তাপপ্রবাহের চূড়ান্ত সময়ে দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা এ সতর্কতার আওতায় ছিলো।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড। জার্মানির পূর্বাঞ্চলের কুবশুটজ এলাকায় রোববার রাতে ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাতের তাপমাত্রা। এর কয়েক ঘণ্টা আগে স্যাক্সনি-আনহাল্টের মোকার্ন-ড্রেভিৎস এলাকায় দিনের সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়।
প্রচণ্ড গরমে জার্মানির বিভিন্ন বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থাকা এলাকাগুলোতে আগুন লাগায় উদ্ধারকাজ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও বিস্ফোরণের ঝুঁকির কারণে সাময়িকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
রাজধানী বার্লিনে তাপজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে জনসাধারণকে স্বস্তি দিতে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে পুলিশের জলকামান দিয়ে ঠান্ডা পানির ছিটা দেয়া হয়।
তাপপ্রবাহে জার্মানির সড়ক ও রেল অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে মহাসড়কের কংক্রিট ফেটে যাচ্ছে এবং রেললাইনের ক্ষতির কারণে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একটি ট্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়লে ৬০০-এর বেশি যাত্রীকে উদ্ধার করতে হয়। এ ঘটনায় দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে সুইডেনে বজ্রপাতে একটি বিনোদন পার্কে কয়েকজন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত এক নারীসহ তিনজনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ডেনমার্কে রেকর্ড তাপমাত্রার পর শুরু হয়েছে তীব্র বজ্রঝড়। দেশটিতে একদিনেই ১ হাজার ১৫৬টি বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
গ্রিসের পাঁচটি অঞ্চলে দাবানলের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির সতর্কতা জারি করেছে দেশটির সিভিল প্রোটেকশন সংস্থা।
এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা জোট ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব না থাকলে ইউরোপে গত সপ্তাহের মতো রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতার ঘটনা কার্যত অসম্ভব ছিলো। গবেষকদের মতে, ৫০ বছর আগে এমন তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিলো। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের ঘটনা ২০ বছর আগের তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে।
সূত্র: এনডিটিভি
সবার দেশ/কেএম




























