বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য দেখে কেঁদেছিলাম: সোনিয়া গান্ধী
১৯৯২ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বলে স্মৃতিচারণ করেছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তার মতে, ওই ঘটনা ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদী চেতনার জন্য এক দীর্ঘ ও কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের সূচনা করেছিলো।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নিজের সে অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টেলিভিশনের পর্দায় বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার দৃশ্য দেখার সময় নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। ওই মুহূর্তেই তার উপলব্ধি হয়েছিলো, ভারতের সামনে সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার এক কঠিন ও দীর্ঘ লড়াই অপেক্ষা করছে।
সোনিয়া গান্ধীর ভাষ্য অনুযায়ী,
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা ছিলো না; বরং এটি ভারতের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের ওপর বড় ধরনের আঘাত ছিলো।
তিনি বলেন, সে সময় উত্তর প্রদেশের অযোধ্যাকে কেন্দ্র করে রামজন্মভূমি আন্দোলনের নামে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছিলো, তাতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ভূমিকা ছিলো।
সোনিয়া গান্ধী আরও উল্লেখ করেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য তাকে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং তাদের সহকর্মীদের স্বপ্নের ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিলো। তাদের কল্পিত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ভারত তখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে বলে উপলব্ধি করেছিলেন তিনি।
তবে ভারতের রাজনীতিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানের পেছনে কেবল বিজেপির ভূমিকাকেই দায়ী করেননি এ প্রবীণ রাজনীতিক। অতীতে কংগ্রেসেরও কিছু রাজনৈতিক ব্যর্থতা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভূমিকা ছিলো বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তার এ আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কংগ্রেসের অতীত অবস্থান ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
এদিকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা নিয়ে সোনিয়া গান্ধীর মন্তব্যের পর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি কংগ্রেসকে ‘হিন্দুবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেন।
সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে প্রদীপ ভাণ্ডারি দাবি করেন, সোনিয়া গান্ধী বাবরি মসজিদের জন্য যেমন চোখের পানি ফেলেন, তেমনি বাটলা হাউসের ঘটনা নিয়েও তার আবেগ প্রকাশ পেয়েছিলো। এসব মন্তব্যের মাধ্যমে কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান আবারও প্রকাশ পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিজেপির এ মুখপাত্র আরও অভিযোগ করেন, কংগ্রেস মূলত ‘বাবরপন্থী’ এবং ভগবান রামের বিরোধী। তার দাবি, এ ধরনের দ্বিচারিতার কারণে সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক ভোটব্যাংক ক্রমেই সংকুচিত হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় করসেবকদের একটি বিশাল সমাবেশের মধ্যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটি ধর্মীয় মেরুকরণ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটি ভারতের রাজনীতিতে এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় পরিচয়, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে বিতর্কে বিষয়টি বারবার সামনে আসে। সোনিয়া গান্ধীর সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণ এবং বিজেপির পাল্টা প্রতিক্রিয়া সে পুরোনো বিতর্ককে আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সবার দেশ/এমকেজে




























