দিল্লিতে পাঁচতলা ভবন ধস, ধ্বংসস্তূপের নিচে শতাধিক শিক্ষার্থী
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির দক্ষিণাঞ্চলে একটি পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন ধসে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভবনটিতে মেডিক্যাল কোচিং সেন্টার, করপোরেট অফিস ও খাবারের দোকান থাকায় ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিলো। কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ১০০ থেকে ১৫০ জন আটকে থাকতে পারেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া শিক্ষার্থী।
শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় সাকেত মেট্রো স্টেশনের কাছের সাইদুলাজাব এলাকার ওয়েস্টার্ন মার্গে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভবন ধসের পর পুরো এলাকা মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে কংক্রিটের বিশাল চাঁই, ভাঙা পিলার ও লোহার রড।
উদ্ধারকারীরা এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, ধসে পড়া ভবনটিতে একটি মেডিক্যাল কোচিং ইনস্টিটিউট, কয়েকটি ক্যাফে এবং একাধিক করপোরেট অফিস ছিলো। ভবনের তৃতীয় তলায় কিছুদিন ধরে সংস্কার ও নির্মাণকাজ চলছিলো। শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা পৌনে ৮টার দিকে হঠাৎ করেই পুরো ভবনটি ধসে পড়ে পাশের একটি অস্থায়ী টিনশেড ক্যান্টিনের ওপর।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার সময় ক্যান্টিনটিতে বহু শিক্ষার্থী রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা রবীন্দ্র সিং বলেন, ভবনটি মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিলো এবং এখানে সবসময় শিক্ষার্থী ও তরুণ কর্মজীবীদের ভিড় থাকতো। ঘটনার সময় ক্যান্টিনে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক ধুলার মেঘে ঢেকে যায়। ধুলো সরে গেলে দেখা যায়, পুরো ভবনটি মাটিতে মিশে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ ও কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।
দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন ২৫ বছর বয়সী নীলম নামে এক মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। বিদেশ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে তিনি পাশের একটি মেডিক্যাল একাডেমিতে স্নাতকোত্তর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার বাবা বলবন্ত যাদব জানান, দুর্ঘটনার সময় নীলম ক্যান্টিনে অবস্থান করছিলেন। উদ্ধারকারীরা তাকে জীবিত বের করে আনলেও তার একটি পা ভেঙে গেছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পরপরই ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। ফ্লাডলাইটের সাহায্যে রাতভর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজ চালানো হচ্ছে। ঘটনাস্থলে স্বজন, সহপাঠী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় জমেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে অনেকে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিস (ডিএফএস) জানিয়েছে, প্রথমে তিনটি দমকল ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় পরে আরও দমকল ইঞ্জিন, উদ্ধারকারী যান ও বিশেষজ্ঞ দল মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, দিল্লি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং National Disaster Response Force-এর সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছেন।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করা হচ্ছে। স্টিলের গার্ডার ও কংক্রিট কাটতে হাইড্রোলিক কাটার, জ্যাক এবং বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন উদ্ধারকারীরা। আটকে পড়াদের অবস্থান শনাক্ত করতে ভিকটিম-লোকেশন ক্যামেরা, আর্থ-অগার ড্রিলিং যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত সন্ধানী কুকুরও কাজে লাগানো হচ্ছে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের কর্মকর্তা ধর্মবীর সিং বলেছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহত ও আটকে পড়াদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে জীবিতদের দ্রুত উদ্ধার এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
দক্ষিণ দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার অনন্ত মিত্তাল জানান, সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে ভবন ধসের খবর পাওয়ার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে মেহরাউলি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।
এদিকে ভবন ধসের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটির নির্মাণ অনুমোদন, মালিকানা এবং চলমান নির্মাণকাজে কোনও ধরনের অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সবার দেশ/কেএম




























