Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:১০, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গুর ভয়ংকর বিস্তার, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা

ঢাকার বাইরে আক্রান্ত বেশি • ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ২, হাসপাতালে ৭৯০ • হামের সঙ্গেও বাড়ছে চিকিৎসার চাপ • আইসিইউ-শয্যা সংকট

ডেঙ্গুর ভয়ংকর বিস্তার, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে এবার গ্রামাঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এডিস মশাবাহিত এই রোগ। আগামী এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৭৯০ জন। অন্যদিকে, দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ১১১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা কার্যত হিমশিম খাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সামনে আরও বৃষ্টিপাত হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়তে পারে। কারণ, বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে। সময়মতো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে না পারায় রাজধানীর পাশাপাশি দেশের জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকাতেও এডিস মশার বিস্তার ঘটছে।

ঢাকার বাইরেই বেশি আক্রান্ত

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের ডেঙ্গুর অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো—রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরে আক্রান্তের হার বেশি। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় অনেক রোগীকে ঢাকার হাসপাতালে আনা হচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।

সরেজমিনে রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে রোগীর ব্যাপক চাপ দেখা গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কিছুক্ষণ পরপর ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগী আসছেন। অনেক হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ডে শয্যা সংকটের পাশাপাশি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র—আইসিইউ নিয়েও তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ।

ঢাকার বাইরে চিকিৎসা সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় রোগীদের একটি বড় অংশ উন্নত চিকিৎসার আশায় রাজধানীমুখী হচ্ছেন। রোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় তারা ঢাকায় এসেছেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, ডেঙ্গু ও হামের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসার প্রয়োজন নেই। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেই এসব রোগের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। ফলে রোগীর চাপ কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

একাধিকবার আক্রান্তদের ঝুঁকি বেশি

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যারা এর আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এবার জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে প্রথমবার আক্রান্তদের একটি বড় অংশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, হামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে এবং মৃত্যুর হারও কমেছে। তবে এর সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ যুক্ত হওয়ায় দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। প্রথমবার আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। তবে এ বছর ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ায় বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মশক নিধনে ব্যর্থতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। অথচ রাজধানীর পাশাপাশি জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও মশক নিধন কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে। ফলে এডিস মশা এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

নিপসমের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, এ বছর ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হচ্ছে। সময়মতো এডিস মশা নিধন ও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম না নেয়ায় রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এডিস মশার বিস্তার ঘটছে।

তার মতে, আগে এডিস মশার প্রজনন মূলত সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক ছিলো। সেখানকার উৎসস্থলগুলো নিয়মিত ধ্বংস করা গেলে ঢাকার বাইরে এর বিস্তার অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব হতো। কিন্তু ঢাকার বাইরের উপজেলা ও পৌরসভাগুলোও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে মশক নিধন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন ছাড়া দেশব্যাপী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

হাসপাতালেই বাড়ছে চাপ

ডেঙ্গু ও হামের রোগী একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শয্যা ও আইসিইউ সংকটও প্রকট হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তচাপ ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমেই রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে কি না তা দেখতে হবে। রক্তচাপ কমে গেলে বা অন্য কোনও জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন। শুধু ডেঙ্গু হয়েছে—এ কারণে আইসিইউ বা হাসপাতালের বেডের জন্য ছোটাছুটি করার প্রয়োজন নেই। ডেঙ্গু ও হামের প্রাথমিক চিকিৎসা হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকেও দেয়া সম্ভব।

ডেঙ্গু কর্নারের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও পৃথক ডেঙ্গু কর্নার চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পুনরায় আক্রান্ত হলে ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই উপসর্গ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও খাবারে অরুচির মতো উপসর্গ দেখা দিলে এনএস-১ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি।

শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলেন তিনি।

সরকার-জনগণের যৌথ উদ্যোগ জরুরি

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চিকিৎসাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল প্রধানত মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানিতে তৈরি হওয়ায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রাম, বালতি, ডাবের খোসা কিংবা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই নিয়মিতভাবে এসব স্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো না গেলে সামনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সামনে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া না হলে আগামী এক মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবার দেশ/এমকেজে

শীর্ষ সংবাদ:

হরমুজে নির্দিষ্ট সময় ছাড়া মার্কিন সুরক্ষা সম্ভব নয়
তরুণদেরকেই দায়িত্ব নিয়ে দেশটা গড়তে হবে: প্রধানমন্ত্রী
অভিষিক্ত রাজাউল্লাহর রেকর্ডে পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য কামব্যাক
ছাত্রশক্তির কাউন্সিল আজ, গোপন ভোটে নির্বাচিত হবে নেতৃত্ব
ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন শুরু আজ
ডেঙ্গুর ভয়ংকর বিস্তার, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা
অপসংস্কৃতি জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে: জামায়াত আমির
আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে ইরান
৫-৭ দিনের মধ্যে গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী
ঘরে ঢুকে ছাত্রদল নেতাকে পেটালো নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ
সৌদি জাহাজে নিষেধাজ্ঞা, শর্ত দিলো হুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আ.লীগের অংশ নেয়ার সুযোগ নেই: শাহে আলম
‘হৈ হৈ, রৈ রৈ, বিএনপিরা গেলি কই’—স্লোগানে ছাত্রলীগের মিছিল
ফারাক্কার ১০৯ গেট খোলা, বাড়ছে পানি, বন্যার আভাস
ক্যারিয়ারের শুরুতেই শুনেছিলেন, ‘নাচে তুমি জিরো’
ক্ষমার আদর্শের নামে জুলাই ধুয়ে যাওয়ার পথে!
লংমার্চে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হলে আমরাই আগে করতাম: প্রধানমন্ত্রী
পুনর্বহালের সুযোগ নেই ৮,৭৯৬ বিডিআর সদস্যের: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলি, ৪ নৌকা জব্দ
বিলুপ্ত হলো র‍্যাব, পাস এসআরবি বিল