Sobar Desh | সবার দেশ রংপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২:০৯, ৬ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২২:১১, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বিএনপির প্যাডে সার ডিলারের তালিকা, আছে স্বজন-আ.লীগ-জাপার নাম

বিএনপির প্যাডে সার ডিলারের তালিকা, আছে স্বজন-আ.লীগ-জাপার নাম
ছবি: সংগৃহীত

রংপুরের পীরগাছায় সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের মধ্যেই নতুন করে একটি তালিকা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতির স্বাক্ষর করা দলীয় প্যাডে তৈরি ওই তালিকায় বিএনপি নেতাদের স্বজনদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের নামও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নয়জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের তদন্ত না হওয়ার মধ্যেই গত ১৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম (রাঙ্গা) স্বাক্ষরিত ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামের নতুন তালিকাটি সামনে আসে।

নথিতে দেখা যায়, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, উপজেলা-পীরগাছা, জেলা-রংপুর’ লেখা দলীয় প্যাডে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম (রাঙ্গা) স্বাক্ষর ও সিলমোহর দিয়েছেন। তালিকায় তার পদবি হিসেবে ‘সভাপতি-পীরগাছা উপজেলা বিএনপি, রংপুর’ উল্লেখ রয়েছে। এতে তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বরও দেয়া হয়েছে।

তালিকায় পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের মোট ১৯ জনের নাম রয়েছে। তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে তিনজন করে ছয়জন এবং কান্দি ইউনিয়নে একজনের নাম দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া কল্যাণী, পারুল, কৈকুড়ি, ছাওলা, ইটাকুমারী ও অন্নদানগর ইউনিয়নে দুজন করে মোট ১২ জনের নাম রয়েছে।

তালিকাটি যাচাই করে দেখা যায়, এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, একজন ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির অনার্সপড়ুয়া মেয়ে, ইউনিয়ন বিএনপির এক সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে এবং আরেক সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে।

তালিকায় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি একজন, সাবেক সভাপতি একজন, সাধারণ সম্পাদক চারজন, সাংগঠনিক সম্পাদক একজন, সহ-কোষাধ্যক্ষ একজন, বিএনপি সমর্থক দুজন এবং কৃষক দলের একজনের নাম রয়েছে। এর বাইরে একজন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতির ছেলে, একজন আওয়ামী লীগ সভাপতি, একজন জামায়াতকর্মী এবং জাতীয় পার্টির দুই নেতার নামও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল আমীনের মেয়ে মোছা. সুইটি বেগমের নাম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী বলে তালিকাটি যাচাই করে জানা গেছে। দ্বিতীয় নামটি ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছগির আলীর ছেলে আব্দুল জলিলের। তৃতীয় নাম জাহেদুল ইসলামের, যিনি একই এলাকার আব্দুল আউয়ালের ছেলে এবং জামায়াতের কর্মী বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী মোছা. সুলতানা ফেরদৌসির নাম। দ্বিতীয় নামটি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমির হোসেনের। তৃতীয় নাম নাজমুল হুদার, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি রাঙ্গার ঘনিষ্ঠ সহচর বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

কল্যাণী ইউনিয়ন থেকে তালিকায় থাকা দুজন হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তহিদুল ইসলাম। কান্দি ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত একমাত্র ব্যক্তি আতাউর রহমান ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বলে জানা গেছে।

পারুল ইউনিয়ন থেকে তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার এবং সভাপতি রেজাউল ইসলাম। কৈকুড়ি ইউনিয়নে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে মীর তৌফিক হাসান এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুনছুর আলী সরকার।

ছাওলা ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেন এবং কৃষক দলের সঙ্গে যুক্ত মিজানুর রহমান। ইটাকুমারী ইউনিয়নে রয়েছেন বিএনপি সমর্থক ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. মাহমুদুল হাসান এবং মো. আলিমুদ্দিন। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং তিনি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অন্নদানগর ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছে জয়িতা আক্তার জিনির নাম। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। একই ইউনিয়নের দ্বিতীয় নাম মো. মাহাবুর রহমানের। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ফুফাতো ভাই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে দলীয় প্যাডে স্বাক্ষর করা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা দাবি করেছেন, সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কার্যালয় বা কৃষি অফিসে কোনও তালিকা দেননি। প্রতিবেদকের কাছে তার স্বাক্ষর করা তালিকা রয়েছে জানানো হলে তিনি বলেন, তালিকাটি না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিনও জানিয়েছেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতির দেয়া কোনও তালিকা তিনি পাননি। তিনি বলেন, কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে প্রতি ইউনিয়নের জন্য নাম চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষ থেকে তাকে কোনও তালিকা দেয়া হয়নি। এ ধরনের তালিকা দেয়ার সুযোগও নেই। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। ডিলার নিয়োগে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই তার জবাব দিতে হবে।

এদিকে পীরগাছায় সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা সত্যতা যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়ার পর স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। তিনি কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক। নোটিশে তার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্য, মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও সাংগঠনিক বিরোধ সৃষ্টির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এর আগে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন জিয়াউর রহমান। তার অভিযোগের মধ্যে ছিল অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা দেয়ার বিষয়।

অন্যদিকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সার ডিলার নিয়োগে টাকা নেয়ার অভিযোগকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস। তবে এরপরও সোশ্যাল মিডিয়ায় সার ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

দলীয় প্যাডে তৈরি তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও বিএনপি নেতাদের স্বজনদের নাম ওঠা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—দুই বিষয় মিলিয়ে পীরগাছায় সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সবার দেশ/কেএম