শাপলা চত্বর গণহত্যা মামলা
লতিফ সিদ্দিকী-দীপু মনিসহ আসামিরা ট্রাইব্যুনালে
৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি, পলাতক ৩০ জন
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, দীপু মনিসহ ১১ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এ শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। মামলাটিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিচারসংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
হাজির করা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের
ট্রাইব্যুনালে হাজির করা ১১ আসামির মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এবং শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল রয়েছেন এ তালিকায়।
অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রুপা।
মামলার অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে শুনানির মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে। তবে অভিযোগ গঠন এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতের সিদ্ধান্তই হবে এ মামলার অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পলাতক তালিকায় শেখ হাসিনাসহ ৩০ জন
মামলার মোট ৪১ আসামির মধ্যে ৩০ জন পলাতক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম ও জাহাঙ্গীর কবির নানক।
এ তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ। গণজাগরণ মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারকেও এ মামলার পলাতক আসামিদের তালিকায় রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মধ্যেও একাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ এবং র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান।
এ ছাড়া সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মারুফ হাসান, অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন ও মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এসএম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এসএম শিবলী নোমান এবং মতিঝিল থানার সাবেক ওসি বিএম ফরমান আলীর নামও পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ মে ঘিরে মামলা
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক চলে আসছে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হতাহতের সংখ্যা, অভিযান পরিচালনার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বক্তব্য ও দাবি উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত বিবরণ এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণে বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, সাবেক মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। অভিযোগ গঠনের শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগের ধরন, আসামিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্য এবং পরবর্তী বিচারিক পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে নজর
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিচারিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ মামলায় অভিযোগ গঠন হলে পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ এবং আসামিপক্ষের বক্তব্য শোনার মতো বিচারিক ধাপ সামনে আসতে পারে।
তবে অভিযোগ গঠন করা মানেই আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তিতর্ক এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতেই প্রত্যেক আসামির দায় নির্ধারিত হবে। ফলে এ মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সবার দেশ/এমকেজে




























