গায়ের জোরে ইরানিদের দমানো যাবে না: পেজেশকিয়ান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হুমকি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে দমানো যাবে না। তিনি দাবি করেছেন, ইরানিরা সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করছে। একই সঙ্গে আলোচনার জন্য তেহরান প্রস্তুত থাকলেও শক্তির ভাষা মেনে নেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে চালানো সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেন। বক্তব্যের সময় তিনি ইরানের মিনাব শহরের একটি বিদ্যালয়ে হামলায় নিহত শিশুদের ছবি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। তার দাবি, যুদ্ধের শুরুতে ওই হামলায় কোমলমতি শিশুরা নিহত হয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি এমন একটি দেশ থেকে এসেছেন, যেখানে কোনও আইনি ভিত্তি ছাড়াই তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে এবং একটি বিদ্যালয়ে বোমা হামলা চালিয়ে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি এসব ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহি ও বিচার দাবি করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল ও বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তার ভাষায়, এসব হামলার পরও ইরান নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান কোনও দেশের ওপর যুদ্ধ শুরু করেনি এবং নিজেদের রক্ষার ক্ষেত্রে তেহরান কারও অনুমতির প্রয়োজন মনে করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের জবাবও দেন পেজেশকিয়ান। ট্রাম্প জাতিসংঘে ইরানকে নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়ার পর পেজেশকিয়ান বলেন, কোনও ধরনের হুমকি বা চাপের কাছে ইরান মাথা নত করবে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত চাপ ও শক্তি প্রয়োগ ইরানের জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়িয়ে দেবে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে হুমকির পরিবেশে নয়। তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে তেহরানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে কোনও শক্তির ভাষায় ইরানের সঙ্গে কথা বলার প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। তবে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকেও তেহরান সরে যাবে না।
এ সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথিত দ্বৈতনীতিরও সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তার দাবি, ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট জবাবদিহি নেই, অথচ আলোচনার টেবিলে থাকা অবস্থায় ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানো হয়েছে।
ফিলিস্তিন সংকটের প্রসঙ্গও তার ভাষণে উঠে আসে। গাজায় ব্যাপক প্রাণহানির জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফিলিস্তিনিদের আত্মরক্ষার অধিকারকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা অন্যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, মানুষ যখন নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ বা আক্রান্ত হয়, তখন আত্মরক্ষার চেষ্টা করা মানবিক স্বভাব। এ মৌলিক অধিকারকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করা উচিত নয়।
ভাষণের শেষ দিকে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করে পেজেশকিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা, অতিরিক্ত চাপ ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। তবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা ও কূটনৈতিক সমাধানের জন্য তেহরান প্রস্তুত রয়েছে।
জাতিসংঘে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ ও পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তীব্র। এর এক দিন আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে কঠোর চাপ প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
সবার দেশ/কেএম




























