Sobar Desh | সবার দেশ আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ১৪:৪১, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্যায় বন্ধ নেপালের বিদ্যুৎ রফতানি, সংকটে বাংলাদেশ

দুই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত, বাংলাদেশে সরবরাহ কার্যত শূন্যে; কমেছে আদানির বিদ্যুৎও

বন্যায় বন্ধ নেপালের বিদ্যুৎ রফতানি, সংকটে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

নেপালে ভয়াবহ বন্যার কারণে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে দেশটির বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিলো, সে বিদ্যুতের উৎস হিসেবে অনুমোদন পাওয়া দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে গত সপ্তাহ থেকে প্রকল্প দুটির উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

নেপালের ভোটেকোশি নদী এলাকায় গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানার পর দেশটির বিদ্যুৎ খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বন্যার পানির তোড়ে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাবে শুধু বাংলাদেশে নয়, নেপালের সামগ্রিক বিদ্যুৎ রফতানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

গত বুধবার নেপালের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

বাংলাদেশে সরবরাহকারী দুই প্রকল্পই বন্ধ

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানির জন্য নেপালের যেসব প্রকল্পের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে, তার মধ্যে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্প দুটি হলো ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

বন্যার পর গত সপ্তাহ থেকে প্রকল্প দুটির বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ভারতে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলী প্রকল্প থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন রয়েছে। এ দুই প্রকল্পের বিদ্যুৎ ভারতের সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে সরবরাহের ব্যবস্থাও অনুমোদিত হয়েছিলো।

কিন্তু বন্যায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যত থেমে গেছে।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে নেপাল।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রফতানি কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে। তবে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।

১২ প্রকল্পে উৎপাদন বন্ধ

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি শুধু চিলিমে ও ত্রিশূলী প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পর থেকে দেশটির অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

এর ফলে নেপালের সামগ্রিক বিদ্যুৎ রফতানিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। বর্ষা মৌসুমে সাধারণত নেপাল গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানি করে থাকে। কিন্তু বন্যার পর রফতানির পরিমাণ কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

অর্থাৎ দুর্যোগের কারণে নেপালের বিদ্যুৎ রফতানি সক্ষমতার একটি বড় অংশ সাময়িকভাবে হারিয়ে গেছে।

তবে নেপালের সামগ্রিক বিদ্যুৎ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভারতসহ বিভিন্ন বাজারে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশে সরবরাহ, কারণ বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত উৎস হিসেবে থাকা প্রকল্প দুটিই বর্তমানে বন্ধ।

বিদ্যুৎ আমদানিকারক থেকে রফতানিকারক নেপাল

একসময় বিশেষ করে শুষ্ক শীত মৌসুমে নেপাল নিজেই বিদ্যুৎ আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গত কয়েক বছরে দেশটি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রফতানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২১ সালে বিদ্যুৎ রফতানি শুরু করে। এরপর ভারতীয় বিদ্যুৎবাজারে প্রবেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ রফতানির উদ্যোগ নেয় দেশটি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও বাংলাদেশে মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৯৩২ কোটি নেপালি রুপি মূল্যের বিদ্যুৎ রফতানি করেছে নেপাল। ফলে বিদ্যুৎ রফতানি দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নতুন খাত হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিলো।

এমন সময়ে ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের উচ্চাভিলাষী বিদ্যুৎ রফতানি পরিকল্পনায় সাময়িক বড় ধাক্কা এসেছে।

বাড়ানোর কথা ছিলো বাংলাদেশে সরবরাহ

বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রফতানি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিলো দুই দেশের। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-নেপাল জ্বালানিসচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের বাইরে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রফতানির বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিলো।

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্তও হয়েছিলো।

কিন্তু পরে ভারত জানায়, বিদ্যমান সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহের সুযোগ নেই।

এরপর গত জুনে অনুষ্ঠিত নেপাল-ভারত জ্বালানিসচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকেও নেপাল বিষয়টি আবার তুলে ধরে। বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানির অনুমোদন দিতে ভারতকে পুনরায় অনুরোধ জানানো হয়।

বর্তমান বন্যা পরিস্থিতির পর নেপালের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে—একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন অবকাঠামো দ্রুত পুনরুদ্ধার করা, অন্যদিকে বিকল্প প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য ভারতের অনুমোদন নিশ্চিত করা।

কমেছে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহও

এদিকে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার খবরের মধ্যেই ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশে সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশে আদানির জনসংযোগ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ‘ফাইভ ডব্লিউ কমিউনিকেশনস’ জানিয়েছে, ভারতে রেলপথে তীব্র জট এবং পণ্য পরিবহন ও বোঝাইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।

ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম কয়লা পৌঁছাচ্ছে। প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সমন্বয় করতে হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখার জন্য দিনের অফ-পিক সময়ে কিছুটা কম বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে সরবরাহ বজায় রাখতে উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সূচিতে সাময়িক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগ

একই সময়ে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যত বন্ধ এবং আদানির গোড্ডা কেন্দ্র থেকে সরবরাহও কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি করা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

যদিও নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত, তবু আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এ বন্যা একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে উৎপাদন ও আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সরবরাহকে হঠাৎ ব্যাহত করতে পারে, নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ।

বর্তমানে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালুর জন্য চালু থাকা অন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রফতানির অনুমতি পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে ভারতের অনুমোদন, সঞ্চালন সক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে।

সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট

সবার দেশ/এমকেজে

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:

লেখকের ঋণ ১.২ বিলিয়ন ডলার, বই লিখেছেন ধনী হওয়ার উপায়!
এসআরবি প্রতিষ্ঠা নতুন মোড়কে র‍্যাবকে ফিরিয়ে আনা: নাহিদ ইসলাম
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কোনও স্লোগান নয়, পরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দ্রুত সংবিধান সংশোধন বিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের প্রত্যাশা অধরাই রইলো: টিআইবি
সেফটি ভালভের ত্রুটিতে অনিশ্চিত রূপপুরের বিদ্যুৎ
মন্ত্রী বললেন—‘হারপিক নিয়ে আসেন, আমি পরিষ্কার করে দিই’
‘বেনজীর কোথায়?’—অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে আবারও চিঠি
গুমের বিরুদ্ধে আইন, নাকি আস্থার বিরুদ্ধে আপস?
মির্জা আব্বাসের কান্নাভেজা বক্তব্যে থমকে গেলো সংসদ
১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার ৮৭ শতাংশ
৫ মাস পর সংসদে মির্জা আব্বাস
এনআইডি নয়, জন্মেই ‘এক-আইডি’
উল্টো পথে মন্ত্রীর গাড়ি, পুলিশের দুই মামলা
বন্যায় বন্ধ নেপালের বিদ্যুৎ রফতানি, সংকটে বাংলাদেশ
প্রমাণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করুন: আসিফ মাহমুদ
নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২০৪
বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে আপত্তিকর ভিডিও, দুই শিক্ষক বরখাস্ত