পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা, নাগরিকদের ৫ নির্দেশনা ইরানের
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলা মোকাবিলায় নাগরিকদের জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক নির্দেশিকা প্রচার করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় দূষণ থেকে সুরক্ষা, নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে অন্তত ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ ভবনের ভেতরে অবস্থান এবং সরকারি নির্দেশনা ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরপরই আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বের হওয়া কিংবা বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখতে যাওয়ার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শ এড়াতে নাগরিকদের তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
নির্দেশিকায় নাগরিকদের জন্য পাঁচটি করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।
- প্রথমত, বিস্ফোরণের আলোর দিকে সরাসরি তাকানো যাবে না। পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় অত্যন্ত তীব্র আলোর ঝলকানি তৈরি হয়, যা চোখের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এ সময় দ্রুত কোনও শক্ত দেয়াল বা মজবুত প্রতিবন্ধকের আড়ালে আশ্রয় নিতে হবে। বিস্ফোরণের ধাক্কা বা ব্লাস্ট ওয়েভ অতিক্রম না করা পর্যন্ত মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে মাথা ও মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, বিস্ফোরণের ধাক্কা কেটে গেলে দ্রুত নিকটবর্তী কোনো মজবুত ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। ভবনের জানালা, দরজা ও বাইরের দেয়াল থেকে যতটা সম্ভব দূরে অবস্থান করতে হবে। বিস্ফোরণের ছবি তোলা কিংবা পরিস্থিতি দেখার জন্য বাইরে থাকা যাবে না। একই সঙ্গে গাড়িকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কারণ সাধারণ গাড়ি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারে না।
- তৃতীয়ত, তেজস্ক্রিয় ধুলা বা কণার সংস্পর্শে এলে শরীরের উন্মুক্ত অংশ দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। এ জন্য কুসুম গরম পানি ও সাবান দিয়ে ত্বক ধুয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে কন্ডিশনারযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। গোসলের ব্যবস্থা না থাকলে ভেজা কাপড় বা ওয়েট ওয়াইপস দিয়ে মুখ, হাত এবং শরীরের অন্যান্য উন্মুক্ত অংশ পরিষ্কার করতে হবে। দূষিত পোশাক খুলে আলাদা ব্যাগে রাখতে হবে, যাতে তেজস্ক্রিয় কণা অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে।
- চতুর্থত, বিস্ফোরণের পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা ঘরের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে। এ সময়ে বাইরে যাতায়াত যথাসম্ভব বন্ধ রাখতে হবে। খাবার ও পানির ক্ষেত্রে বোতলজাত পানি এবং সিল করা প্যাকেটজাত খাবার ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাইরে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা খাবার ও পানি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- পঞ্চমত, ২৪ ঘণ্টা পার হলেই পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে গেছে বলে ধরে নেয়া যাবে না। কখন আশ্রয়কেন্দ্র বা ভবন থেকে বের হওয়া যাবে, সে বিষয়ে সরকারি ঘোষণা ও জরুরি সম্প্রচারের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। তবে আশ্রয় নেয়া ভবনে আগুন লাগলে কিংবা ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে নিরাপদ বিকল্প আশ্রয়ে সরে যেতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ ধরনের সতর্কতামূলক নির্দেশিকা প্রচারের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতার মধ্যে পারমাণবিক হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের নতুন পর্যায় শুরু হয়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। বিভিন্ন সময়ে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ গত রাতেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে পারমাণবিক বিস্ফোরণ মোকাবিলার নির্দেশনা প্রচারকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ নির্দেশিকা প্রচারের অর্থ এ নয় যে ইরানের ওপর আসন্ন পারমাণবিক হামলার বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য রয়েছে। এটি সম্ভাব্য চরম জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত কি নতুন কোনও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে, নাকি এ নির্দেশিকা কেবল নাগরিক সুরক্ষার প্রস্তুতির অংশ? আপাতত ইরানের এ উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























