এআইয়ের ভুল পরামর্শে দাফন, কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা
এআই চ্যাটবটের দেয়া পরামর্শ মেনে মায়ের দাফনের তারিখ নির্ধারণের পর পরিবারে একের পর এক দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে—এমন অভিযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন চীনের এক ব্যক্তি।
চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের জিয়াশান কাউন্টির বাসিন্দা শি দাবি করেছেন, এআই চ্যাটবটের দেয়া বিভ্রান্তিকর পরামর্শের কারণে তার পরিবারের মধ্যে মানসিক চাপ, দূরত্ব ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি সফটওয়্যারটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেইজিং চুনতিয়ান ঝিইউন টেকনোলজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। তবে ক্ষতিপূরণের অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
জিমু নিউজ ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত এপ্রিলে। শির মা মারা যাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে তার দাফনের জন্য একটি শুভ দিন নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। চীনা ঐতিহ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্তে এখনও অনেকে প্রাচীন পঞ্জিকা ও গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের ভিত্তিতে শুভ দিন বেছে নেন।
শি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মায়ের দাফনের তারিখ নির্ধারণের আগে তিনি একজন ফেং শুই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেন। ওই বিশেষজ্ঞ ২০ এপ্রিল দাফনের জন্য উপযুক্ত দিন হিসেবে সুপারিশ করেন। কিন্তু শি দেখতে পান, ২০ এপ্রিল তার মায়ের মৃত্যুর চতুর্থ দিন। স্থানীয় কিছু প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শেষকৃত্যের ক্ষেত্রে জোড় সংখ্যার দিনকে অশুভ মনে করা হয়। এ কারণে তিনি বিকল্প মতামত নিতে একটি এআই চ্যাটবটের সাহায্য নেন।
শির দাবি, চ্যাটবটটি ১৯ এপ্রিলকে দাফনের জন্য শুভ দিন হিসেবে সুপারিশ করে। একই সঙ্গে শেষকৃত্যের শোভাযাত্রার আগে কাগজের তৈরি ঘোড়া ও টাকা পোড়ানোর পরামর্শও দেয়। চীনা লোকাচার অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির পরকালীন প্রয়োজন মেটানোর প্রতীক হিসেবে এসব সামগ্রী পোড়ানোর প্রচলন রয়েছে।
তবে চ্যাটবটের উত্তরে অসংগতি খুঁজে পান শি। এক জায়গায় ১৯ এপ্রিল সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে দাফনের পরামর্শ দেয়া হলেও অন্য অংশে একই দিনকে শুভ নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
ততক্ষণে অবশ্য আত্মীয়স্বজনকে ১৯ এপ্রিলের শেষকৃত্যের সময়সূচি জানিয়ে দিয়েছিলেন শি। ফলে নতুন করে তারিখ পরিবর্তনের সুযোগও ছিলো না।
শির দাবি, শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিন পর পরিবারের এক আত্মীয় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময় প্রকাশ করা হয়নি। তবে পরিবারের কয়েকজন সদস্য ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে দাফনের তারিখের একটি সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করেন। তাদের ধারণা, ভুলভাবে শেষকৃত্য আয়োজনের কারণে পরিবারের ফেং শুই নষ্ট হয়েছে এবং সেখান থেকেই দুর্ভাগ্যের সূত্রপাত।
চাকরির চুক্তিপত্রসহ বিভিন্ন কাজে নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন শি। তার অভিযোগ, এবার চ্যাটবট তাকে পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। এর প্রভাব পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও পড়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
পরিস্থিতির পর শেষ পর্যন্ত সফটওয়্যারটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেইজিং চুনতিয়ান ঝিইউন টেকনোলজির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন শি। মামলায় তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
তবে মামলার একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, নিজের মামলার প্রস্তুতিতেও শি একই এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিয়েছেন। জানা গেছে, চ্যাটবটটি তাকে আইনি নথির খসড়া তৈরি এবং মামলা করার প্রক্রিয়া বুঝতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, কোম্পানিটি আদালতে জানিয়েছে, তাদের চ্যাটবটের দেয়া উত্তর কোনোভাবেই অনলাইন আইন লঙ্ঘন করে না। প্রতিষ্ঠানটির সেবার শর্তাবলিতে বলা আছে, এআইয়ের তৈরি তথ্য কেবল তথ্যসূত্র বা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা উচিত; এগুলোকে পেশাদার পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। সফটওয়্যার ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীরা এসব শর্তে সম্মতি দেন বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে শি সে ব্যবহারকারী চুক্তির শর্তকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার অভিযোগ, এসব শর্ত ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত দায় চাপিয়ে দেয় এবং এআইয়ের দেয়া তথ্যের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক করে না। একই সঙ্গে এআইয়ের উত্তরের উৎস যাচাই ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নে বলে দাবি করেছেন তিনি।
স্থানীয় একটি আদালতে মামলাটির শুনানি হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে এআই-নির্ভর পরামর্শের কারণে সৃষ্ট কথিত ক্ষতির জন্য সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে কতটা দায়ী করা যায়, সে বিষয়ে পরবর্তী অবস্থান।
সবার দেশ/কেএম




























