প্যারিসে ২৩ মণ্ডপে দুর্গোৎসব, সম্প্রীতির মিলনমেলা
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবমুখর পরিবেশ ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজাকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আবহ। এ বছর প্যারিস ও এর আশপাশে ২৩টি অস্থায়ী পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে।
প্যারিস থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম জানান, প্যারিস মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদ, ফ্রান্সের উদ্যোগে শহরের উপকণ্ঠ ওভারভিলিয়ারের একটি হলরুমে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী পূজামণ্ডপ। সেখানে আয়োজন করা হয়েছে প্যারিসের অন্যতম বৃহৎ শারদীয় দুর্গোৎসবের। পূজা-অর্চনা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠেছে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ।
গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি। বিশেষ করে মহাষ্টমীতে ওভারভিলিয়ারের পূজামণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের উপস্থিতিও উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আসেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব এবং আয়বার মহাসচিব কাজী এনায়াত উল্লাহ ইনু। এ সময় তিনি মণ্ডপে অবস্থান করেন এবং আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
ফ্রান্স বিএনপির পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক সহসভাপতি শাহ জামান ও রশীদ পাটয়ারি, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা এবং জুনায়েদ আহমেদ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার সংগঠন এফডিএইচআরের সাংগঠনিক সম্পাদক ও অ্যাক্টিভিস্ট খালেদ মাহমুদ।

পূজাকে ঘিরে প্যারিসের অস্থায়ী মণ্ডপগুলোতে প্রতিদিন চলছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন বয়সী মানুষ মণ্ডপে সমবেত হচ্ছেন। বিশেষ করে বিকেল থেকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এ আয়োজন বাংলাদেশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য পরিণত হয়েছে এক আনন্দঘন মিলনমেলায়।
মণ্ডপগুলোতে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে দেবী দুর্গার আরাধনা করছেন ভক্তরা। পাশাপাশি চলছে শুভেচ্ছা ও সৌহার্দ্য বিনিময়। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ প্রবাসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশকে আরও দৃঢ় করছে।
ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক উৎসব
দুর্গাপূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। এতে স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথি শিল্পীরাও সংগীত পরিবেশন করছেন। বাংলা গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করতে বিকেল থেকেই মণ্ডপে সমবেত হচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। শিল্পীদের পরিবেশনায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে পুরো অনুষ্ঠানস্থল।
আয়োজকেরা মনে করেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা, গান ও সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
পূজামণ্ডপে শিশু-কিশোর ও তরুণদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি তারা বাংলা গান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও কমিউনিটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে শারদীয় দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন নবায়নেরও উপলক্ষ। পূজাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর অনেকের সঙ্গে অনেকের দেখা হচ্ছে। ব্যস্ত জীবনের বাইরে একত্র হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনেরা। আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছেন তারা।
প্রতিকূলতা পেরিয়ে উৎসবের আয়োজন
ফ্রান্সে শারদীয় পূজা উদ্যাপন কমিটির অন্যতম নেতা শুভ্রত শুভ বলেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এবার অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হচ্ছে। কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর শুরু হওয়া দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। শেষ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চলবে। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের।
সব মিলিয়ে প্যারিসে এবারের দুর্গাপূজা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধর্মীয় আবেগ, বাংলা সংস্কৃতির চর্চা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক বর্ণাঢ্য আয়োজনে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি এ আয়োজন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক বন্ধন জোরদার করছে।
সবার দেশ/এফও




























