হোটেল সংকটে কোলকাতার রাস্তায় বাংলাদেশি রোগীরা
কোলকাতায় হোটেল সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনরা। নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে একের পর এক হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থাকার জায়গা হারিয়েছেন অনেকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ক্যান্সার রোগীদের নিয়েও স্বজনদের কেউ কেউ ফুটপাত ও রাস্তার পাশে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
কোলকাতার প্রাণকেন্দ্র ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও নিউমার্কেট এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চিকিৎসা ও ব্যবসার কাজে সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা পড়েছেন বাড়তি ভোগান্তিতে। শুধু বাংলাদেশিরাই নন, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসার জন্য কোলকাতায় আসা অনেক মানুষও একই সংকটে পড়েছেন।
গত ১৮ আগস্ট মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে সাতজন বাংলাদেশি ও দুজন ভারতীয় নিহত হন। ওই ঘটনার পর কলকাতা প্রশাসন শহরের হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
কোলকাতা পুরসভা শহরের ৭০০টির বেশি হোটেল ও গেস্টহাউসকে নোটিশ দিয়েছে। নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলো খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এসব জায়গায় নতুন অতিথি রাখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য কোলকাতায় যাওয়া রোগী ও তাদের স্বজনরা থাকার জায়গা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
গত কয়েক দিনে ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল চত্বর ও আশপাশের এলাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের ভিড় বেড়েছে। লাগেজ নিয়ে অনেককে বৃষ্টির মধ্যেও রাস্তার পাশে অবস্থান করতে দেখা যাচ্ছে। ক্যান্সার রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও কেমোথেরাপির প্রয়োজন হওয়ায় হাসপাতালের কাছাকাছি থাকার প্রয়োজন থাকলেও সে সুযোগ এখন অনেকেরই নেই।
হোটেল না পেয়ে চরম হতাশায় বাংলাদেশিরা
হোটেল না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু হোটেল ও আবাসন ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন।
ঢাকার এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হোটেল মালিকরা সুযোগ পেয়ে টাকা নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তিনি আর কোলকাতায় না আসার কথাও জানান।
এক রোগীর স্বজন বলেন, ক্যান্সার একটি জটিল রোগ। কেমোথেরাপি নেয়া রোগীদের হাসপাতালের কাছাকাছি থাকা জরুরি। কিন্তু হোটেল না পাওয়ায় তাদের চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
আরেক বাংলাদেশি জানান, তারা নিয়ম মেনেই ভিসা ও প্রয়োজনীয় কর দিয়ে চিকিৎসার জন্য কোলকাতায় এসেছেন। শহরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আগেই তাদের জানানো উচিত ছিলো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এক নারী জানান, তার রোগী হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু থাকার জায়গা না থাকায় তাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। আশপাশে পর্যাপ্ত শৌচাগার না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
হঠাৎ হোটেল ছাড়ার অভিযোগ
আরেক বাংলাদেশি অভিযোগ করেন, তাকে হঠাৎ করেই হোটেল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় থানাকে জানানো হলেও কোনও সহায়তা পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
রোগীকে হাসপাতালে রেখে দেশে ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। ফলে একদিকে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে থাকার জায়গার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের।
ঠাকুরপুকুর এলাকায় তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশি রোগীদের একটি বড় অংশ সেখানে যায়। হাসপাতালের আশপাশের গেস্টহাউসগুলোতেও তুলনামূলক কম খরচে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যেতো। কিন্তু প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে সেসব জায়গা থেকে বের করে দেয়া হলে বিপাকে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার রুপি খরচ করে বড় হোটেলে থাকা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব নয়।
অস্থায়ী আশ্রয়ের দাবি
ঠাকুরপুকুরের এক গেস্টহাউস মালিক জয়ন্ত সাউ বলেন, মুমূর্ষু রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা তা করতে পারছেন না।
সরকারের প্রতি অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগের সময় যেভাবে মানুষকে সরিয়ে ত্রাণশিবিরে রাখা হয়, বর্তমান সংকটেও তেমন অস্থায়ী ব্যবস্থা করা উচিত।
এদিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার। জায়গা সীমিত হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ৫৫ জন রোগী ও স্বজনকে ভেতরে থাকার ব্যবস্থা করেছে।
তবে হাসপাতালের এ উদ্যোগের পরও সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। ভারত ও বাংলাদেশের শতাধিক মানুষ এখনও থাকার জায়গা না পেয়ে রাস্তায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
চিকিৎসা না ফেলে দেশে ফেরার উপায় নেই, আবার থাকার মতো হোটেলও মিলছে না—এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন তারা। নিউমার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের নেয়া পদক্ষেপ জরুরি হলেও, এর প্রভাবে চিকিৎসার জন্য আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে।
সবার দেশ/কেএম




























