মাঝআকাশে সহ-পাইলটের ছুরিকাঘাত, ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে গেলো বিমান
টিভি দেখে বিমান সামলান প্লাম্বার, পাইলটের প্রাণ বাঁচালেন ডেন্টিস্ট
মাঝআকাশে হঠাৎ ককপিট থেকে ভেসে এলো চিৎকার। মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেলো ১৭৪ যাত্রী বহনকারী একটি যাত্রীবাহী বিমানের পরিস্থিতি। ককপিটে এক পাইলট আরেক পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেছেন। গুরুতর আহত ক্যাপ্টেন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। আর বিমানটি দ্রুত নেমে যাচ্ছে হাজার হাজার ফুট নিচে।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পেশাদার পাইলট না হয়েও ককপিটে ঢুকে বিমানের নিয়ন্ত্রণে হাত দেন এক যাত্রী। পেশায় প্লাম্বার ইয়ানিভ হায়ুন জানান, বিমান দুর্ঘটনার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘Air Disasters’ দেখে পাওয়া ধারণা থেকেই তিনি বুঝেছিলেন, নিচের দিকে নেমে যাওয়া বিমানকে কীভাবে সাময়িকভাবে ওপরে তোলার চেষ্টা করতে হয়।
অন্যদিকে বিমানে থাকা এক ডেন্টিস্ট ছুটে যান রক্তাক্ত ক্যাপ্টেনের কাছে। তিনি জরুরি চিকিৎসা দিয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং পাইলটের রক্তচাপ স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেন।
শেষ পর্যন্ত কয়েকজন যাত্রীর সাহসিকতা, আহত ক্যাপ্টেনের শেষ মুহূর্তের বুদ্ধিমত্তা এবং বিমানে থাকা অতিরিক্ত পাইলটদের তৎপরতায় ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
ককপিটে ছুরিকাঘাত
ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে। বিমানটিতে ছিলেন ১৭৪ জন যাত্রী। ফ্লাইটটি আকাশে থাকা অবস্থায় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমানি সহ-পাইলট ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত হন ক্যাপ্টেন। একই সময়ে বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতা হারায় মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে। যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি পরিস্থিতির সংকেত পাঠানো হয় এবং বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের দিকে নেয়া হয়।
ঘটনার উদ্দেশ্য কী ছিলো, তা এখনও তদন্তাধীন। ফ্লাইদুবাই ঘটনাটিকে দুই পাইলটের মধ্যে একটি ‘altercation’ বা সংঘর্ষ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে।
রক্তাক্ত অবস্থাতেও দরজা খুললেন ক্যাপ্টেন
ককপিটের ভেতরে তখন পরিস্থিতি প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গুরুতর আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছার মেঝেতে পড়ে ছিলেন। কিন্তু চরম সংকটের মধ্যেও তিনি ককপিটের দরজার রিলিজ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সক্ষম হন।
এ ঘটনাই পরবর্তী মুহূর্তে যাত্রীদের ককপিটে ঢোকার সুযোগ করে দেয়।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মারাত্মকভাবে আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেনের এ পদক্ষেপ যাত্রীদের ককপিটে প্রবেশ এবং হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সুযোগ তৈরি করে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরে ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তবে হামলার পেছনে সহ-পাইলটের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনও তদন্ত চলছে।
ককপিটে ছুটলেন প্লাম্বার
ককপিটের দরজা খুলতেই কয়েকজন যাত্রী দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়েন। তাদের একজন ছিলেন ইয়ানিভ হায়ুন।
পেশায় প্লাম্বার হায়ুন জানান, তিনি প্রথমে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণ থেকে সরানোর চেষ্টা করেন। এরপর বুঝতে পারেন, বিমানটি ভয়াবহভাবে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে এবং ককপিটের নিয়ন্ত্রণে কার্যকরভাবে কেউ নেই।
তখনই তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণের হ্যান্ডেল ধরে পেছনের দিকে টানতে শুরু করেন।
কিন্তু তিনি তো পাইলট নন। বিমান চালানোর কোনও পেশাগত প্রশিক্ষণও তার ছিলো না।
তাহলে কীভাবে বুঝলেন কী করতে হবে?
হায়ুনের উত্তর—টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘Air Disasters’।
তিনি জানান, বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে প্রচারিত ওই অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে তিনি বুঝেছিলেন, বিমান নাক নিচের দিকে নামতে থাকলে নিয়ন্ত্রণের হ্যান্ডেল টেনে সেটিকে ওপরে তোলার চেষ্টা করতে হয়। সে ধারণাই সংকটের মুহূর্তে কাজে লাগান তিনি।
হায়ুনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণ ধরে টান দেয়ার পর বিমান ধীরে ধীরে সমতায় ফিরতে শুরু করে। এরপর বিমানে থাকা একজন পেশাদার পাইলট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।
একজন সাধারণ যাত্রীর ওই কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত যে বিপর্যয় এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো, তা পরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে।
ডেন্টিস্টের হাতে জরুরি চিকিৎসা
ককপিটে তখন আরেকটি জীবন-মরণ লড়াই চলছিলো।
রক্তাক্ত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের কাছে ছুটে যান বিমানে থাকা ইসরায়েলি ডেন্টিস্ট ড. শোতা মুসায়েভ।
মুসায়েভ জানান, তিনি চিৎকার শুনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ককপিটের দিকে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন ক্যাপ্টেন গুরুতর আহত এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
আমি বিমানের একমাত্র চিকিৎসক ছিলাম—পরে সাংবাদিকদের কাছে এমনটাই জানান মুসায়েভ। তিনি আহত পাইলটের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন এবং তার রক্তচাপ স্থিতিশীল রাখার জন্য জরুরি চিকিৎসা দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাপ্টেনের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত ছিলো। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক ছিলো যে দ্রুত চিকিৎসা দেয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
একই সময়ে হামলাকারী যাতে আবার আক্রমণ করতে না পারে, সে জন্য মুসায়েভ ও অন্য যাত্রীরা তাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেন। হাতের কাছে থাকা তার ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
২০ মিনিটের লড়াই
হামলাকারীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে যাত্রীদের প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট লড়াই করতে হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে জানা গেছে।
ইয়ানিভ হায়ুনের সঙ্গে আরও কয়েকজন যাত্রী ককপিটে ঢুকে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। একজন হামলাকারীকে ধরে রাখেন, অন্যরা তাকে বেঁধে ফেলতে সাহায্য করেন।
এ সময় বিমানটি আকাশে অস্থিতিশীল অবস্থায় ছিলো। কেবিনের যাত্রীরা আতঙ্কে ছিলেন। কেউ কেউ সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন। কয়েকজন যাত্রী জানান, বিমান হঠাৎ নিচে নেমে যাওয়ায় তারা নিজেদের আসন থেকেও ছিটকে পড়েছিলেন।
তবে যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত ককপিটের নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন।
তাবুকে নিরাপদ অবতরণ
বিমানে থাকা অতিরিক্ত পাইলটরা শেষ পর্যন্ত বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর ফ্লাইটটির গন্তব্য পরিবর্তন করে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমান অবতরণের পর যাত্রীদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়। পরে ১৭৪ যাত্রীকে নিরাপদে ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেয়া হয়।
গুরুতর আহত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী প্রতিবেদনে তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে।
তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন—কেনো?
ভয়াবহ এ ঘটনার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেনো একজন সহ-পাইলট মাঝআকাশে নিজের সহকর্মীর ওপর হামলা চালালেন?
এখনও এর নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। সৌদি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে। হামলার উদ্দেশ্য এবং কীভাবে ককপিটে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হলো, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করার কথা।
ফ্লাইদুবাইও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান না করার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মাঝআকাশে কয়েক মিনিটের ভয়াবহ সংকটে একজন আহত পাইলটের শেষ মুহূর্তের বুদ্ধিমত্তা, একজন প্লাম্বারের সাহসী সিদ্ধান্ত, একজন ডেন্টিস্টের চিকিৎসা সহায়তা এবং কয়েকজন যাত্রীর সম্মিলিত প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত ১৭৪ জনকে সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে।
যে বিমানটি কয়েক মুহূর্তের জন্য অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ছুটে যাচ্ছিলো, সেটিই শেষ পর্যন্ত নিরাপদে মাটিতে ফিরে আসে।
মাঝআকাশের সে ভয়াবহ ঘটনায় তাই শুধু একজন পাইলট নন—বেঁচে ফেরার গল্পে নাম লিখিয়েছেন কয়েকজন সাধারণ যাত্রীও।
সবার দেশ/এমকেজে




























