গুপ্ত-স্বৈরাচার আবার একসঙ্গে হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা মোকাবিলায় সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। তার অভিযোগ, দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’ আবার একসঙ্গে হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ এবং মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং পূর্ববর্তী শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত আইনের শাসন পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করবে। জনগণ বিএনপি সরকারের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের নেয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ অব্যাহত রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করার চেষ্টা হলেও আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের মানুষ তা রক্ষা করেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনেও মানুষ জেগে উঠেছিলো এবং স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় দেশে গণতন্ত্র না থাকায় মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। গণতন্ত্র থাকলেই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব। তাই যারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
‘স্বৈরাচার ও গুপ্ত আবার একসঙ্গে হয়েছে’
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচার’ পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিন পরই ‘গুপ্ত বাহিনীর’ লোকজন বলেছিলো, তারা ফিরে এলে বা রাজনীতি করলে তাদের কোনও আপত্তি নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, অতীতেও এ দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ছিলো।
তিনি বলেন,
৯১ সালেও তারা একসঙ্গে ছিলো, ৮৬ সালেও একসঙ্গে ছিলো। গত নির্বাচনের সময়ও তারা একসঙ্গেই ছিলো; তলে তলে কাজ করেছিলো। এজন্য তাদের গুপ্ত বলা হয়। আজ আবার তারা এবং ওরা, যারা পালিয়ে গেছে—এ স্বৈরাচার এবং গুপ্ত আবার একসঙ্গে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, যারা ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করে, তাদের সঙ্গে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনও সম্পর্ক নেই। তারা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপির কর্মসূচি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানী, নদী খনন ও উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব কার্যক্রম সফল হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।
তিনি বলেন, কোনও এলাকায় গণ্ডগোল বা অরাজকতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন।
উপজেলা হাসপাতাল ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা
উপজেলা হাসপাতাল নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনেক উপজেলা হাসপাতাল ৫০ শয্যার। আগামী পাঁচ বছরে এসব হাসপাতালকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক উপজেলার মানুষকে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, অতীতে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আনার চেষ্টা চলছে। কলকারখানা চালু হলে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।
ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড বিতরণ
ফুলগাজীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফেনীর ওই এলাকার ৫১০ জন নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া সারাদেশে এক লাখ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। কৃষকদের একটি ফসলের জন্য সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দেয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পে ব্যয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা
ফেনীর পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে খেয়াঘাট মুহুরী ব্রিজ এলাকায় প্রকল্পটির ফলক উন্মোচন করেন তিনি।
প্রকল্পের আওতায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে।
পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং সিলোনিয়া নদীতে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত বর্ষার পানি ধরে রাখা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শুকনো মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যেই নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে কৃষিজমি ও মানুষের বসতবাড়ি বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ
ফেনী সফরে প্রধানমন্ত্রী ফুলগাজীতে বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরে ফুলগাজী জেলা পরিষদ ডাকবাংলো পরিদর্শন করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সরকারি ভবনগুলোতে মোট ৯৬২ দশমিক ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাগলনাইয়ায় ৪১৫ কিলোওয়াট, পরশুরামে ২৯৮ কিলোওয়াট এবং ফুলগাজীতে ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে।
কুমিল্লায় মহাসড়কের পাশে নেতাকর্মীদের অবস্থান
ফেনী সফরের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে সড়কপথে যাওয়ার সময় কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ শুভেচ্ছা জানান।
দাউদকান্দি, চান্দিনা, নিমসার, পদুয়ার বাজার, আলেখারচর ও চৌদ্দগ্রাম এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেন। প্রধানমন্ত্রী গাড়িবহর নিয়ে এসব এলাকা অতিক্রম করার সময় তিনি গাড়ির ভেতর থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফরকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা অংশে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্যের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন।
হাটহাজারীতে ভার্চুয়ালি কৃষক কার্ড বিতরণ
ফেনীর কর্মসূচি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতেও ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
মির্জাপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১ হাজার ১০৮ কৃষক-কৃষাণীর মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়। বিকেলে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মো. হেলাল উদ্দিন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো মূল্যে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নে সরকারের নেয়া কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করলে দেশের মানুষ তা প্রতিহত করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সবার দেশ/কেএম




























