বার্ধক্যের প্যাডেলে জীবনের ভার
সকালের কুয়াশা ভেদ করে শহরের রাস্তায় যখন একে একে রিকশাগুলো চলতে শুরু করে, তখন সবার চোখে পড়ে না একজোড়া কাঁপা হাত আর ঝুঁকে পড়া একটি পিঠ। ব্যস্ত শহরের কোলাহলে এমন দৃশ্য যেন খুব স্বাভাবিক, কিন্তু সে স্বাভাবিকতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে একেকটি জীবনের গভীর সংগ্রামের গল্প। তেমনই একজন মানুষ যশোরের রহমাতুল্লাহ (৭০)। বয়স তাকে বার্ধক্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু জীবনের দায় তাকে থামতে দেয়নি।
রহমাতুল্লাহ পেশায় একজন রিকশাচালক। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে তার শরীর আজ ক্লান্ত, হাড়ে হাড়ে জমেছে পরিশ্রমের চিহ্ন। তবুও প্রতিদিন ভোরে তিনি রিকশার হ্যান্ডেল ধরেন। কারণ এ একটি কাজই তার পরিবারের বেঁচে থাকার ভরসা। শুধু নিজের জন্য নয়, তার পরিবারও নির্ভরশীল তার এ শ্রমের উপর।
তার ছেলেরাও রিকশা চালায়, কিন্তু অভাবের সংসারে আয়ের পথ যতই বাড়ুক, চাহিদার শেষ নেই। শিক্ষা, স্বপ্ন, উন্নতির আশা—সবকিছুই থেমে গেছে বহু আগেই। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনই নতুন করে লড়াই করতে হয়। আর এ লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ান রহমাতুল্লাহ নিজেই। তার অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ আর পরিবারের প্রতি অটুট ভালোবাসা তাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি জোগায়।
রিকশার প্যাডেলে পা রাখলেই যেন তিনি নিজের বয়স ভুলে যান। কখনও প্রখর রোদ, কখনও ঝুম বৃষ্টি—কোনোটাই তার জন্য বাধা নয়। কারণ একদিন রিকশা না চালালে চুলায় আগুন জ্বলে না। শরীর ব্যথায় অবশ হয়ে এলে তিনি কিছুক্ষণ থামেন, একটু দম নেন, তারপর আবার চলতে শুরু করেন। বিশ্রাম তার জীবনে এক প্রকার বিলাসিতা, যা তিনি চাইলেও সহজে পান না।
এ শহরে প্রতিদিন হাজারো মানুষ রিকশায় চড়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন, সে গন্তব্যে পৌঁছাতে কার ঘাম ঝরে, কার বুকের ভেতর জমে থাকে অজস্র না বলা কষ্ট। রহমাতুল্লাহর জীবনে বড় কোনও স্বপ্ন নেই। তার চাওয়া খুব সাধারণ—ছেলেদের পেট ভরে খাওয়ানো, অসুস্থ হলে ওষুধ কিনতে পারা, আর দিন শেষে একটু শান্তির ঘুম।
বার্ধক্য তার শরীরকে দুর্বল করেছে, কিন্তু তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। সমাজের কাছে তিনি হয়তো শুধুই একজন বৃদ্ধ রিকশাচালক, কিন্তু নিজের পরিবারের কাছে তিনি এখনও আশ্রয়, ভরসা আর শেষ শক্তির প্রতীক।
এ গল্প আসলে একজন রহমাতুল্লাহর নয়। এটি হাজারো অবহেলিত শ্রমজীবী বাবার প্রতিচ্ছবি, যারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সন্তানের দায় কাঁধে নিয়ে চলেন নিরলসভাবে। শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া এমন মানুষগুলোর কষ্ট যদি এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের চোখে পড়ে, তাতেই এ গল্পের সার্থকতা।
লেখক:
শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়




























