ফ্রান্সজুড়ে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, সংঘর্ষে উত্তাল শহর
প্যারিসে ২৪ মেট্রো স্টেশন বন্ধ, প্রায় এক হাজার গ্রেফতারের খবর; নিরাপত্তায় ৭০ হাজার সদস্য মোতায়েন।
শিক্ষা খাতের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নামেন। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও দোকানপাটে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম সদস্য মোতায়েন করে কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে প্যারিসে ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) দাবি করেছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। সংগঠনটির হিসাবে, শুধু প্যারিসেই সমবেত হন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ।
শিক্ষা সংকট থেকে রাজপথে ক্ষোভ
বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের শুরু। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও সরকারি পরিষেবার সংকটের প্রতিবাদে এতে যোগ দেন শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কার প্রয়োজন এবং শিক্ষকসংকটের কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ নিয়েও আপত্তি রয়েছে তাঁদের একাংশের। ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন, সিজিটি, সিএফডিটি ও সলিদেয়ারের মতো শ্রমিক সংগঠনও বিক্ষোভে অংশ নেয়। মজুরি বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট নিরসন তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে।
কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
প্যারিসে বিক্ষোভ শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে কয়েকটি স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। লিয়োঁ, লিল, নিস, মার্সেই, মঁপেলিয়ে, নঁত ও তুলুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি স্থানে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ।
লিয়োঁতে নিষিদ্ধ এলাকায় জমায়েত ও সড়ক অবরোধের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। বোর্দো ও নিসেও বিধিনিষেধের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের জমায়েতের খবর পাওয়া গেছে। তবে সব শহরে পরিস্থিতি একই রকম ছিলো না।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঘিরে দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্যারিসে মেট্রো বন্ধ, কড়া নিরাপত্তা
বিক্ষোভে আগের সপ্তাহের ভাঙচুর ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার করে প্রশাসন। পুলিশ ও জঁদার্ম সদস্যদের পাশাপাশি সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়।
নিরাপত্তাজনিত কারণে প্যারিসে ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। কয়েকটি মেট্রো ও ট্রাম লাইনে চলাচলও সীমিত করা হয়। এতে যাত্রীদের বিকল্প পথে চলাচল করতে হয়। সম্ভাব্য হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরের দোকানপাটের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। প্যারিসের কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্যারিসে মিছিলের পথ নির্ধারণ নিয়েও বিরোধ দেখা দেয়। নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে পুলিশ প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় রুটের পরিবর্তে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে পোর্ত দিতালির কাছ থেকে মিছিল শুরুর নির্দেশ দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো বিকল্প পথ মেনে নিলেও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের বিধিনিষেধ প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করে। তবে প্রশাসনের বক্তব্য, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
আলোচনা হলেও কাটেনি অসন্তোষ
বিক্ষোভের আগে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর বৈঠক হলেও আন্দোলনকারীদের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতের সংকট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ব্যবস্থার সমস্যার সমাধান চাইছেন। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে অনড় রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা
দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কয়েকটি সংগঠন। ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের কর্মীরা আগামী শনিবার পার্লামেন্ট ও নগরভবনের সামনে সমাবেশ ও অবস্থানের ডাক দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁও দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
শিক্ষা খাতের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর। একই সঙ্গে পরিবহন পরিষেবা স্বাভাবিক হওয়া এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা শিথিল করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবার দেশ/কেএম




























