Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:১২, ৩০ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১০:১২, ৩০ আগস্ট ২০২৬

সেপ্টেম্বরে আসছে বড় মামলা

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ, হদিস নেই আড়াই শ মানুষের

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ, হদিস নেই আড়াই শ মানুষের
প্রতীকী ছবি

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া প্রায় আড়াই শ ব্যক্তির ঘটনায় একটি বড় মামলা প্রস্তুত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। এসব অভিযোগের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের নিখোঁজের ঘটনাও রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিখোঁজ হওয়া আড়াই শ ব্যক্তির অভিযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর ধরন ও ঘটনার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, এসব গুমের মধ্যে একটি অভিন্ন ও পদ্ধতিগত ধারা রয়েছে।

এ লক্ষ্যে গুম বিষয়ে অভিজ্ঞ পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তাকে নিয়ে বিশেষ তদন্তদল গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম নিজেই তদন্তটির তত্ত্বাবধান করছেন। তদন্ত শেষ করে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের চেষ্টা চলছে।

প্রায় ৩০০ অভিযোগ

চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০টি গুমের অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫০টি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তাদের কাছে আসা অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক ঘটনার পদ্ধতি প্রায় একই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে অথবা সাদা পোশাকে লোকজনকে বাড়ি কিংবা বিভিন্ন স্থান থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়েছে। এরপর তাদের আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তার ভাষায়, এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে এবং একই ধরনের পদ্ধতিতে সংঘটিত হওয়ায় এগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত করা হচ্ছে।

‘মায়ের ডাক’ থেকে ১৫০ অভিযোগ

তদন্তাধীন ২৫০ অভিযোগের মধ্যে ১৫০টি এসেছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ থেকে। আরও ৬০টি অভিযোগ এসেছে ‘আমরা গুম পরিবার’ থেকে। বাকি ৪০টি অভিযোগ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমে এসেছে।

তদন্তকারীরা এরই মধ্যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোথা থেকে, কবে এবং কীভাবে তুলে নেয়া হয়েছিলো—এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ভুক্তভোগীদের ছবি সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেয়া হয়েছে। অনেকের বক্তব্য রেকর্ডও করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), ভিডিও ফুটেজ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রমাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে তদন্ত প্রতিবেদন

তদন্তের পরিধি বড় হওয়ায় কাজটি সময়সাপেক্ষ হলেও সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তদন্ত শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।

মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো ঘটেছে। কিছু ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপহরণের পর বিভিন্ন ধরনের তথ্য-প্রমাণ রেখে গেছেন। সেগুলো সংগ্রহ ও যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তে গুম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। চিফ প্রসিকিউটরসহ কয়েকজন প্রসিকিউটর নিয়মিত তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন।

পরিবারগুলোর সঙ্গে গণশুনানি

আড়াই শ নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গণশুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ২৫ আগস্ট গুমের শিকার ৬০ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।

আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভব হলে প্রতিটি পরিবারের ঘটনার জন্য পৃথক অভিযোগ রাখা হবে। তবে বিচার একসঙ্গে করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রসিকিউশন।

কেনো গুমের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে গুমসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় আনা হয়।

২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর জারি করা সংশোধনী অধ্যাদেশে অপহরণ, দাসত্ব, বেআইনি আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক নির্বাসন, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক গুম, মানবপাচার, যৌন দাসত্বসহ বিভিন্ন অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রোম সংবিধির আলোকে এসব অপরাধের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাপক বা পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত গুমের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়াতেও ব্যাপক বা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে সংঘটিত গুমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিধান রাখা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, খসড়া আইনটি বিল আকারে পরবর্তী সংসদে উত্থাপিত হবে বলে তারা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন।

ট্রাইব্যুনালে গুমের তিন মামলার বিচার

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বর্তমানে গুমসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলার বিচার চলছে।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গোপন বন্দিশালা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল-এ গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দুটি মামলা রয়েছে।

টিএফআই সেল মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী পলাতক হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি। তাদের মধ্যে অপরাধ সংঘটনের সময় র‌্যাবে কর্মরত ১০ জন সেনা কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে রাখা হয়েছে; অন্য আসামিরা পলাতক হিসেবে বিচারাধীন।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এ মামলার বিচার শুরু হয়। ইতোমধ্যে সাতজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

জেআইসি মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ১২ কর্মকর্তা রয়েছেন। তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিক, সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজাহার সিদ্দিক এবং সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এ মামলার বিচার শুরু হয়। এ পর্যন্ত সাতজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

অন্য মামলাটি সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে এ মামলায়। এ পর্যন্ত নয়জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ মামলারও পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ ৩১ আগস্ট।

তদন্তে আরও ১০ মামলা

গুমের অভিযোগে আরও ১০টি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। এর মধ্যে সাতটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর অধীনে এবং তিনটি ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধীনে তদন্ত হচ্ছে।

এসব মামলায় মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান তিনটি মামলায় আসামি।

এ ছাড়া গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন আরও আট আসামি। তাদের মধ্যে রয়েছেন র‌্যাব-১০-এর সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মো. মহিউদ্দিন ফারুকী, সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা মো. সোহাইল ও মো. ফজলুর রহমান, কর্নেল আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদ, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা রিফাত নিলয় জোয়ারদার।

‘ঐতিহাসিক মামলা’ হওয়ার সম্ভাবনা

প্রসিকিউশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫০টি গুমের অভিযোগকে একই বিচারপ্রক্রিয়ার আওতায় আনা হলে এটি দেশের ইতিহাসে গুমসংক্রান্ত সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হতে পারে।

প্রতিটি পরিবারের ঘটনার জন্য পৃথক অভিযোগ থাকলেও একসঙ্গে বিচার করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রসিকিউশন মনে করছে, এতে একদিকে বিচারপ্রক্রিয়ার সময় কমবে, অন্যদিকে একই ধরনের ও পদ্ধতিগত গুমের অভিযোগগুলো একটি সমন্বিত বিচারিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।

তদন্ত শেষ করে আসছে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

সবার দেশ/এমকেজে

শীর্ষ সংবাদ:

মেসির ‘হালি’তে মন্ট্রিয়ল ধ্বংস, ৭-১ গোলে মায়ামির তাণ্ডব
বিলাওয়ালের বিয়ের গুঞ্জন, পাত্রী ইউরোপের!
নেপাল-চীনে বন্যায় মৃত প্রায় ৭০০, নিখোঁজ ৩ হাজার
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ, হদিস নেই আড়াই শ মানুষের
গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
সংসদমুখী পদযাত্রায় ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান
মিরাজ নিখোঁজে ‘গুমের কাহিনী’ সাজানোর চেষ্টা হতে পারে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রংপুরে চার খুন হত্যায় সিদ্ধার্থের বাবা-ভাই ডিবি হেফাজতে
আ.লীগ ফেরার বাতাস শুধু ভারত-সোশ্যাল মিডিয়ায়: সারজিস
ঝুলন্ত সেতু পানিতে তলিয়ে চলাচল বন্ধ রাঙামাটিতে
পাকিস্তানে তুর্কি সামরিক বিমানের আনাগোনা, উদ্বিগ্ন ভারত
২৪ ঘণ্টায় বন্যার শঙ্কায় দুই জেলা
নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তৃতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা
গুমের প্রতিটি ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ও বিচার চান নাহিদ
কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশন
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ আসছে সেপ্টেম্বরে, থাকছে যেসব ফিচার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসাশিক্ষকদের সঙ্গে এনসিপি নেতাদের সাক্ষাৎ