অশ্রুসিক্ত নয়নে চিরবিদায়
ভাত খাওয়া নিয়ে ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
সহপাঠীদের সঙ্গে ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমল হক আজমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার বড় শলুয়া গ্রামের এ মেধাবী শিক্ষার্থীকে শনিবার রাতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলেকে চিরবিদায় জানিয়েছেন বাবা কুতুব উদ্দিন ও স্বজনরা।
এদিকে এ ঘটনায় রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে খুলনার হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহতের বাবা। মামলায় মেসের চারজনের নাম উল্লেখ করে ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
নিহত আজমল হক আজম (২২) দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানাধীন বড় শলুয়া গ্রামের কৃষক কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পরিবারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার জন্য গত ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন আজমল। ভর্তি হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো। তার মৃত্যুতে কৃষক পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে এলাকাবাসীর মধ্যেও দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও শোক।
আজমল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি ছাত্র মেসে সহপাঠীদের সঙ্গে থাকতেন। পরে সহপাঠীদের সঙ্গে মনোমালিন্য হলে তিনি মেসের ডি-৮ নম্বর কক্ষে চলে যান বলে জানিয়েছে পরিবার।
অভিযোগ রয়েছে, শুক্রবার রাতে ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে সহপাঠীদের সঙ্গে আজমলের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাকে বহিরাগত আখ্যা দিয়ে মারধর ও বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিনের দাবি, ছেলেকে বাঁচানোর কথা বলে তার কাছে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিলো।
শনিবার গভীর রাতে ছেলের দাফন শেষে বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পাঁচ দিন পর আজমল বাড়িতে এসেছিলো। পরে শুক্রবার আবার খুলনায় ফিরে যায়। ওই রাত ৯টার দিকে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন আজমল তাকে ফোনে বলেছিলো, আব্বু, আমি চলে এসেছি। আমাকে নিয়ে কোনও চিন্তা করো না।
কুতুব উদ্দিন বলেন, রাত ১২টার পর আজমলের ফোন নম্বর থেকে একজন তাকে ফোন করে জানায়, তার ছেলে সমস্যায় পড়েছে। বিষয়টি সমাধান করতে এক লাখ টাকা লাগবে। টাকা না দিলে ছেলেকে পাওয়া যাবে না বলেও তাকে জানানো হয়।
তিনি বলেন, নিজেকে একজন গরিব কৃষক পরিচয় দিয়ে এক লাখ টাকা দেয়ার সামর্থ্য নেই বলে তিনি জানান। তখন ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাকে দ্রুত ট্রেনে করে খুলনায় আসতে বলা হয়।
এরপর রাতের ট্রেনে খুলনার উদ্দেশে রওনা হন কুতুব উদ্দিন। শনিবার সকাল ৬টার দিকে মেসে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, মেসে তালা ঝুলছে। সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয় এক দোকানদারের কাছ থেকে জানতে পারেন, রাতে মেসে ঝামেলা হয়েছে এবং এক শিক্ষার্থীকে মারধরের পর হাসপাতালে নেয়া হলে তার মৃত্যু হয়েছে।
পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লঅশ দেখতে পান কুতুব উদ্দিন। তার দাবি, আজমলের হাত-পা, মাথা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিলো।
শনিবার ময়নাতদন্ত শেষে রাত ১১টার দিকে আজমলের মরদেহ চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে নেয়া হয়। লাশ পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ। রাত ১২টার দিকে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহতের বাবা বাদী হয়ে মেসের চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
ওসি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তাদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
এদিকে আজমলের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কানাই লাল সরকার। তিনি বলেন, আজমল হোসেন ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলো। ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি শুনেছেন।
উপাচার্য বলেন, বিষয়টি শুনে তিনি হতবাক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনও অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানোর সুযোগ ছিলো। কিন্তু সে কারণে একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আজমলের পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিবারকে আইনি সহযোগিতা করবে। এ ঘটনায় সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মেধাবী এ শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যুতে এখন একটাই প্রশ্ন—সামান্য একটি বিরোধ কীভাবে এমন নির্মম পরিণতি ডেকে আনল? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। তদন্ত ও মামলার অগ্রগতির পরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সবার দেশ/কেএম




























