দাবি থেকে একচুলও সরবো না
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজনে জীবন দেবোব: জামায়াত আমির
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে কোনোভাবেই সরে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এ দাবি থেকে সরে আসতে তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। তবে জনগণের রায়ের প্রশ্নে কোনও চাপ বা লোভই জামায়াতকে অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারবে না।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশ থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানানো হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরে আসতে আমাদের ওপর চাপ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনও লোভ কিংবা চাপ আমাদের জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে একচুলও সরাতে পারবে না। প্রয়োজনে জীবন যাবে, তবু জনগণের সঙ্গে সরকারের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করবো না।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে দেশবাসীকে সংস্কারের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের দিনই তিনি ও তার দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এর মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সব আন্দোলন-সংগ্রামে যারা প্রাণ দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ১৯৭১ সাল থেকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী সব শহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এ আন্দোলনের নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্মের। দেশবাসীর রক্ত ও ত্যাগের ফসলই জুলাই গণঅভ্যুত্থান। তাই কোনও ব্যক্তি বা দল যদি এককভাবে এ আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে কৃতিত্ব দাবি করে, তাহলে জাতি তা মেনে নেবে না।
জুলাই যোদ্ধাদের বিভাজনের বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক আহত যোদ্ধা এখনও হাসপাতালে বা ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। শহিদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সরকার সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, তারা বলছেন, মাত্র পাঁচ মাসে আমরা এত ব্যস্ত হয়ে গেলাম কেনো? আমি পাল্টা প্রশ্ন করি,
মাত্র পাঁচ মাসে আপনারা এত বিশ্বাসঘাতকতা করলেন কেনো? কেনো ফ্যাসিবাদের ফটোকপি হয়ে উঠলেন? এ কারণেই আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য।
তিনি আরও বলেন, জনগণের অধিকার হরণ করা হলে মানুষ ‘অগ্নিগিরির মতো জ্বলে উঠবে’ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হবে আপসহীন ও তীব্র।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীকে বিভেদ সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সে আহ্বান উপেক্ষিত হয়েছে। তার অভিযোগ, সরকারের নেতারাই প্রধানমন্ত্রীকে পতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
নিজেকে ‘রাজাকার’ বলা হচ্ছে উল্লেখ করে অলি আহমেদ বলেন, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করেছিলেন। তাহলে কি তাকেও রাজাকার বলতে হবে? ‘রাজাকার’ ইস্যুর রাজনৈতিক ব্যবহার জনগণ আর শুনতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দেশের মানুষের সর্বত্র একটাই দাবি—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, একদিকে দলীয় ছাত্রসংগঠন ও যুবদলের ‘হেলমেট বাহিনী’ দিয়ে বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার ঐক্যের কথা বলছে, যা ফ্যাসিবাদী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জামায়াতের আমির কোনও ‘লন্ডন চুক্তির’ অংশ ছিলেন না। তিনি জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে না গিয়ে রাজপথে জনতার সঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ না দিয়ে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অবস্থান নেয়াকে তিনি ডা. শফিকুর রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন।
নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী বলেন, গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সরকারের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ৫ আগস্ট মানেই মুক্তি। তিনি অভিযোগ করেন,
বর্তমান বিএনপি আর বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি নয়; দলটি আপসকামী হয়ে পড়েছে। বিএনপি যদি শেখ হাসিনার পথেই হাঁটে, তাহলে জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে আবারও আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বিএনপির ইতিহাস আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের। তিনি সরকারকে ‘নব্য স্বৈরাচার’ না হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, নতুন সরকারও পুরোনো ফ্যাসিবাদের ধারা ফিরিয়ে এনেছে। গুম প্রতিরোধ আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর দেয়ায় বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























