Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০১:৫০, ১৪ মে ২০২৬

হাম সংকটের দায় কি ড. ইউনূসের? তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন বাস্তবতা

হাম সংকটের দায় কি ড. ইউনূসের? তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন বাস্তবতা
প্রতীকি ছবি

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হাম সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস–কে সরাসরি দায়ি করে নানা বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। 

ইউটিউবভিত্তিক আলোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্য–ও সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে এ বিতর্ক নিয়ে বিভিন্ন তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং টিকাদান কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—বাংলাদেশের হাম সংকট কোনও একক ব্যক্তি বা সরকারের সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং এটি বহু বছরের টিকাক্রয় পদ্ধতি, টিকাদান ঘাটতি, কোভিড-পরবর্তী স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জটিলতার সম্মিলিত ফল।

বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি ২০২৬ সালের শুরু থেকে দ্রুত অবনতির দিকে যায়। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গত কয়েক বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কাভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বহু শিশু নিয়মিত টিকা কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মহামারির সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা টিকাজনিত সুরক্ষা ঘাটতি তৈরি হয়। এ প্রভাব বাংলাদেশেও প্রকটভাবে পড়ে।

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান হাম পরিস্থিতির পেছনে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের ধারাবাহিক টিকাদান ব্যর্থতা বড় কারণ। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, কয়েক কোটি শিশু পূর্ণাঙ্গ এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই ছিলো তথাকথিত ‘জিরো-ডোজ’ শিশু—অর্থাৎ যারা জীবনে একবারও হাম টিকা নেয়নি। ফলে সাম্প্রতিক সংক্রমণ হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং বহু বছরের জমে থাকা টিকাদানের বয়সজনিত ঝুঁকি একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে।

এদিকে ড. ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়েছে—বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের প্রভাব।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, পূর্বে বাংলাদেশে শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে UNICEF কার্যত একক প্রভাব বিস্তার করতো এবং টিকাবাবদ বড় অংকের কমিশন ইউনিসেফ তার ঘরে তুলতো। টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার বড় অংশই সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সরাসরি বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস এবং বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে সে একক কর্তৃত্বে পরিবর্তন আসে। এতে ইউনিসেফ স্বভাবতই সরকারের প্রতি নাখোশ হয়। কিন্তু ২০২৫ এ সেপ্টেম্বরে সরকার ইউনিসেফ থেকে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়েছ বলে যে অভিযোগ উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে, সেটা সত্যের অপলাপ মাত্র। কেনোনা ইউনিসেফ সেপ্টেম্বরেই বেশ কয়েকটি টিকা চালান বাংলাদেশকে পাঠিয়েছে-যেটা তাদের একই মাসের ২৪ তারিখের স্বাস্থের ডিজিকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।

নীতিনির্ধারণী মহলের একাধিক পর্যবেক্ষকের মতে, এ পরিবর্তনের পর থেকেই কিছু আন্তর্জাতিক মহল ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনাকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যর্থ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। সরকারের অভ্যন্তরীণ কিছু সূত্রের দাবি, টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় নতুন নীতি ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো চালুর কারণে পূর্বের একচ্ছত্র প্রভাব ক্ষুণ্ন হওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছিলো।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ ধরনের অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয়। UNICEF প্রকাশ্যে কখনোই বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্য সংকটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায় চাপানোর কথা স্বীকার করেনি। বরং সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের আহ্বান জানিয়ে আসছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে স্বাধীন তদন্ত ও নীতিগত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম এবং বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম হাম পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এমন কিছু শিরোনাম ও প্রচারণা চালিয়েছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থান বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান ঘাটতি, কোভিড-পরবর্তী বাস্তবতা বা স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সংকটের চেয়ে শুধুমাত্র ড. ইউনূসকে দায়ী করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বাস্থ্য সংকট প্রায়ই ‘ন্যারেটিভ যুদ্ধের’ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রকৃত জনস্বাস্থ্য সমস্যার চেয়ে রাজনৈতিক দায় চাপানোই অনেক সময় বড় আলোচনায় পরিণত হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ে এবং কার্যকর সমাধানের পথ বাধাগ্রস্ত হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে মূল বিষয় হলো—ধারাবাহিক টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা। এ চারটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ফলে কোনও এক ব্যক্তি বা সরকারের ওপর পুরো দায় চাপিয়ে সমস্যার বাস্তব সমাধান সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে শিশু টিকাদান কর্মসূচিকে পুনর্গঠন করা, স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। কারণ হাম সংকট শেষ পর্যন্ত একটি জনস্বাস্থ্য সংকট—এটি রাজনৈতিক প্রচারণার অস্ত্র নয়।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

বাউফলে নিখোঁজ চার কিশোরী চারদিন পর উদ্ধার
সিলেটে চলন্ত ট্রেনে আগুন, রাতভর আতঙ্কে যাত্রীরা
তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন: আসিফ নজরুল
হাম সংকটের দায় কি ড. ইউনূসের? তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন বাস্তবতা
৫০ ওভারের ম্যাচে ৮২২ রান! প্রতিপক্ষ অলআউট মাত্র ২৮-এ!
ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় উত্তাল জাবি, বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা রাস্তায়
ইরান সংঘাতে ৩৯ মার্কিন বিমান ধ্বংস
গ্রেফতার আতঙ্কে ফিলিপাইনের পার্লামেন্টে আশ্রয়, বের করতে গোলাগুলি
মানুষ দেখলেই গুঁতো দেয়া পশুর নাম রাখলেন ‘নেতানিয়াহু’
ঢাবি কেন্দ্রীয় মসজিদে সাদিক কায়েমের আকদ সম্পন্ন
নবম পে স্কেলের সম্ভাব্য বেতন গ্রেড প্রকাশ
নোয়াখালীতে দুই ডেন্টাল ল্যাবের কার্যক্রম বন্ধ, লাখ টাকা জরিমানা
শার্শার কেমিক্যাল ছিটিয়ে পাকানো হচ্ছে আম, দেখার কেউ নেই
ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ
উচ্চ রক্তচাপ এখন দেশের শীর্ষ রোগ, টেকসই অর্থায়ন জরুরি
মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণ নিয়ে উদ্বেগ: বুয়েটকে গবেষণার নির্দেশ হাইকোর্টের