Sobar Desh | সবার দেশ বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৩৯, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

স্বর্ণ, জমি ও লকারের ‘বৈচিত্র্য’

হলফনামার বাইরে হাসিনার যত গোপন সম্পদ

হলফনামার বাইরে হাসিনার যত গোপন সম্পদ
ফাইল ছবি

শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়—অবৈধ সম্পদ গোপনেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতে পলাতক হাসিনা ও তার পরিবারের নাম ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে প্রকাশিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া তথ্যের বিস্তর অমিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)–এর সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীরা। 

তাদের তথ্য অনুযায়ী, কর নথিতে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার ঘোষণা থাকলেও ব্যাংক লকারে পাওয়া গেছে আনুমানিক ৯ কেজি ৭শ গ্রাম, বাজারমূল্যে যার পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি টাকা। হলফনামায় ৫ দশমিক ২ একর কৃষিজমির কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে প্রায় ২৯ একর জমির তথ্য। এছাড়া নামে–বেনামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়ের জমি-ফ্ল্যাট পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানকারী সংস্থাগুলোর দাবি।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের কর–সম্পদ তদন্ত শুরু করে দুদক ও সিআইসি। সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, লকার রেকর্ড ও নির্বাচনী হলফনামা পর্যালোচনায় উঠে আসে আলোচিত এসব বৈষম্যের তথ্য। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আয়কর রিটার্নে শেখ হাসিনা স্বর্ণের মূল্য উল্লেখ করলেও পরিমাণ উল্লেখ করেননি—যা কর আইনের প্রচলিত রীতি থেকে ভিন্ন। কর কর্মকর্তাদের মতে, মূল্য উল্লেখ করে ভরির তথ্য গোপন করলে প্রকৃত মালিকানা বুঝা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে স্বর্ণের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ জটিল হয়।

এদিকে অগ্রণী ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের তিনটি লকারে অভিযান চালিয়ে মোট ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। পূবালী ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখায় শেখ হাসিনার নামে থাকা লকারে একটি খালি পাটের ব্যাগ পাওয়া যায়—যা ঘিরে নতুন রহস্য তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তদন্ত শুরু হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। একইদিন অগ্রণী ব্যাংকের দুটি লকার খুলে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম লেখা চিরকুটসহ স্বর্ণের অলংকার পাওয়া যায়। দুদকের তথ্যমতে কোন স্বর্ণ কার—তা আলাদাভাবে মার্কিং করা ছিলো, যাচাইয়ের পর পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।

স্বর্ণের বৈধতা ও মালিকানা সম্পর্কে প্রশ্নে দুদক মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, সম্পদ বিবরণী ও জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য মিলিয়ে দেখা হবে। অর্থের উৎস যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ না হলে তা অবৈধ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি আরও জানান, ২০০৭ সালের সম্পদ বিবরণীতে শেখ হাসিনা নিজ নামে তিনটি লকারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে বিচারক, দুদক, সিআইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লকার তিনটি খোলা হয়।

নির্বাচনী হলফনামায় শেখ হাসিনা কৃষিখাতে প্রায় ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন। ব্যাংক-সঞ্চয়পত্র-এফডিআর সহ আর্থিক খাতে দেখিয়েছেন প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদ। স্বর্ণালংকার দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার। স্থাবর সম্পদের মধ্যে পূর্বাচলে একটি প্লট ও ঢাকায় বাড়িসহ ১৫ বিঘা কৃষিজমি প্রদর্শিত হয়েছে—যা তদন্তে পাওয়া জমির তথ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

রাজধানীতে শতকোটি টাকার সম্পদের তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। গুলশান নিকেতনের ৭২ নম্বর বাড়ি শেখ রেহানার, কিন্তু কর নথিতে মালিক হিসেবে দেখা যায় রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে। বারিধারার কে-ব্লকের আরেকটি বাড়ির মালিক কাগজে নসরুল হামিদ বিপু হলেও কর নথি অনুযায়ী প্রকৃত মালিকানা দেখানো হয়েছে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে। সেগুনবাগিচাতেও শেখ রেহানার নামে একটি ফ্ল্যাটের তথ্য মিলেছে।

সম্প্রতি হবিগঞ্জে এক গণশুনানিতে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সম্পদের হিসাব ছিলো ‘গোছালো নয়’, আর তখনকার অনুসন্ধানে ২৯ একর কৃষিজমির তথ্য পাওয়া গেলেও তা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি।

স্বর্ণ, লকার ও জমির নতুন অনুসন্ধান এখন আগের সমস্ত আলোচনাকে ছাড়িয়ে বড় জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দুদক বলছে—তদন্ত চলছে, উৎস ও বৈধতা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়। তবে লুকোনো স্বর্ণ ও নথির রহস্য সমাধান হলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-আর্থিক আলোচনায় বড় বদলও আসতে পারে।

সবার দেশ/কেএম