Sobar Desh | সবার দেশ বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৫৮, ৫ মে ২০২৬

আপডেট: ০১:০৩, ৫ মে ২০২৬

ফুটপাত কার? পথচারীর, নাকি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের?

ফুটপাত যদি পথচারীদের না হয়, তাহলে শহর আর নাগরিকদের থাকে না; শহর চলে যায় দখলদারদের হাতে। আর রাষ্ট্র যখন সে দখলদারিত্বকে কার্ড দিয়ে বৈধতা দেয়, তখন সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান।

ফুটপাত কার? পথচারীর, নাকি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের?
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর গুলিস্তান এখন আর শুধু একটি বাণিজ্যিক এলাকা নয়, এটি যেন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া আর চাঁদাবাজ অর্থনীতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী। যে ফুটপাত সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য নির্মিত, সেটি আজ পরিণত হয়েছে দখল, চাঁদাবাজি আর পুনর্বাসন বাণিজ্যের স্থায়ী বাজারে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এ পুরো প্রক্রিয়া এখন আর গোপন নয়; বরং প্রশাসনিক বৈধতার মোড়কে প্রকাশ্যেই চলছে।

কয়েকদিন আগেও সিটি করপোরেশন ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘হকারমুক্ত অভিযান’ চালিয়েছিলো। টিভি ক্যামেরার সামনে বুলডোজার, মাইকিং, উচ্ছেদ—সবই ছিলো। জনগণ ভেবেছিলো অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও ফুটপাত পথচারীদের ফিরে দেয়া হবে। কিন্তু সে নাটকের পর্দা নামতেই দেখা গেলো, একই হকারদের আবার ‘হকার কার্ড’ দিয়ে পুনর্বাসনের নামে ফুটপাতেই বসানো হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কি উচ্ছেদ অভিযান, নাকি নতুন লাইসেন্স বাণিজ্যের উদ্বোধন?

গুলিস্তানের বাস্তবতা আরও ভয়ংকর। এখানে ফুটপাতে বসতে চাইলে আগে দিতে হয় ‘পজিশন ফি’। দুই লাখ, তিন লাখ, কোথাও পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। তারপর প্রতিদিন চাঁদা, মাসিক বিট ভাড়া, বিশেষ দিবসের নজরানা—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার এক অদৃশ্য অর্থনীতি। এ অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে যায় না; যায় লাইনম্যান, সিন্ডিকেট আর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার পকেটে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, রাজনৈতিক পালাবদল হলেও সিন্ডিকেট বদলায় না। শুধু পরিচয়পত্র বদলায়। গতকাল যারা অন্য দলের ব্যানারে ছিলো, আজ তারা নতুন দলের ছায়ায় একই ব্যবসা চালাচ্ছে। নবী, হারুন, বাবুল, সালেহ—নামগুলো কেবল ব্যক্তি নয়, এরা এখন গুলিস্তানের বিকল্প প্রশাসন। কে কোথায় বসবে, কে কত টাকা দেবে, কে উচ্ছেদ হবে—সব সিদ্ধান্ত নেয় এরা। রাষ্ট্র সেখানে কার্যত দর্শক।

আর সিটি করপোরেশন? তারা এখন ‘কার্ড’ দিয়ে এ দখলদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যস্ত। বলা হচ্ছে, কার্ডধারীরা বৈধ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—ফুটপাত দখল কখন থেকে বৈধতা পাওয়ার মতো বিষয় হলো? ফুটপাত কি দোকান বসানোর জন্য তৈরি, নাকি মানুষ হাঁটার জন্য?

কর্তৃপক্ষের যুক্তি আরও হাস্যকর। তারা বলছে, পথচারীদের সমস্যা হলে কার্ড বাতিল করা হবে। যেনো ফুটপাতে দোকান বসিয়ে আবার পথচারীবান্ধব পরিবেশও বজায় রাখা সম্ভব! যে ফুটপাতে দু’জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারে না, সেখানে সারি সারি দোকান বসিয়ে উন্নয়নের গল্প শোনানো জনগণের সঙ্গে নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।

বাস্তবে যা হচ্ছে, তা হলো—রাষ্ট্র জনগণের জায়গা দখলদারদের হাতে ইজারা দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত রাস্তা ও ফুটপাত ব্যবহার হচ্ছে বিশেষ গোষ্ঠীর আয়ের উৎস হিসেবে। আর এ পুরো ব্যবস্থাকে ‘পুনর্বাসন’ নাম দিয়ে নৈতিকতার রং লাগানো হচ্ছে।

হকারদের জীবিকার প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জীবিকার নামে শহরকে জিম্মি করার অধিকার কাউকে দেয়া যায় না। পৃথিবীর কোনও সভ্য নগরে মূল ফুটপাত দখল করে বাজার বসানোর সংস্কৃতি নেই। হকার পুনর্বাসন করতে হলে আলাদা হকার জোন, নির্ধারিত মার্কেট বা বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। কিন্তু এখানে সহজ পথ বেছে নেয়া হয়েছে—জনগণের হাঁটার জায়গাটাই বিক্রি করে দেয়া।

সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো, এ চাঁদাবাজি এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামো। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, অথচ প্রশাসন বলছে তারা ‘জিরো টলারেন্সে’ আছে। যদি সত্যিই জিরো টলারেন্স থাকতো, তাহলে গুলিস্তানের প্রতিটি ফুটপাত কার নিয়ন্ত্রণে—তা জানতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজন হতো না। সবাই জানে কারা টাকা তোলে, কারা ভাগ পায়, কারা পাহারা দেয়।

বাংলাদেশের নগরব্যবস্থাপনা আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকারও দরকষাকষির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাঁটার অধিকার, নিরাপদ চলাচলের অধিকার—সবকিছু এখন সিন্ডিকেটের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।

ফুটপাত যদি পথচারীদের না হয়, তাহলে শহর আর নাগরিকদের থাকে না; শহর চলে যায় দখলদারদের হাতে। আর রাষ্ট্র যখন সে দখলদারিত্বকে কার্ড দিয়ে বৈধতা দেয়, তখন সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

রাতেও বাড়ছে মেট্রোরেলের সময়, কমছে ট্রেনের ব্যবধান
বাংলাদেশে ক্যাম্পাস খুলতে চায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরা
পশ্চিমবঙ্গে ‘পুশ ইন’ হলে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনায় নতুন সিদ্ধান্ত
৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা রাশিয়ার
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে আতঙ্কের কারণ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
পিএসসিতে নিয়োগ, আবেদন শেষ ১১ মে
ঈদের ‘মালিক’-এ চমক, মিলা–প্রতীকের ‘গুলগুলি পিঠা’
কমলো সোনার দাম
‘শাপলা গণহত্যা’র নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন চান জামায়াত আমির
এমপি হলেন নুসরাত তাবাসসুম, গেজেট প্রকাশ
ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’কে ‘প্রজেক্ট ডেডলক’ বললো ইরান
‘শাপলা গণহত্যা’ দিবস আজ
চীনে কারখানায় বিস্ফোরণে নিহত ২১, আহত অর্ধশতাধিক
সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতায় বিজিবি
গণহত্যায় হাসিনাসহ সব অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে হবে