জাতিসংঘে আমাদের ‘বিরাট পদোন্নতি’: ড. ইউনূস
কোণার ছোট কক্ষ থেকে বড় পরিসরে আয়োজন, সামাজিক ব্যবসা ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা তুলে ধরলেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক।
জাতিসংঘ সদর দফতরে একসময় ছোট ও সংকীর্ণ কোণার কক্ষে আয়োজন করতে হতো সামাজিক ব্যবসা নিয়ে অনুষ্ঠান। সে জায়গা ছেড়ে এবার বড় পরিসরে মূলধারার একটি স্থানে আয়োজনের সুযোগ পাওয়াকে নিজেদের ‘বিরাট পদোন্নতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রসিকতার সুরে দেয়া এ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি জাতিসংঘে সামাজিক ব্যবসা, তরুণদের উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী দিনে আয়োজিত ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন ড. ইউনূস। সেখানে তিনি সামাজিক ব্যবসার বিস্তার, ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ছোট কোণার কক্ষ থেকে বড় পরিসরে
অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যের শুরুতে জাতিসংঘে আগের আয়োজনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি জানান, অতীতে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো জাতিসংঘ সদর দফতরের একটি ছোট কোণার কক্ষে অনুষ্ঠিত হতো। জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় সেখানে উপস্থিত সবাইকে করাও কঠিন হয়ে পড়তো।
তবে এবার আয়োজনের পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। উপস্থিত বন্ধু ও বিশ্বনেতাদের দিকে ইঙ্গিত করে ড. ইউনূস রসিকতা করে বলেন, এবার তারা সঠিক জায়গায় বন্ধুদের উপস্থিতি পেয়েছেন। ফলে কক্ষ ও আয়োজন—দুটিই বড় হয়েছে।
তিনি হাস্যরসের সঙ্গে এটিকে ‘বিরাট পদোন্নতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তারা আবার সে কোণার ছোট কক্ষে ফিরে যাবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে বলেও মন্তব্য করেন।
খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণে স্বাগত
বক্তব্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানান অধ্যাপক ইউনূস। সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর সময় পুরো সেশনে তাকে পাশে পাওয়া একটি বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল ও বিভ্রান্তিকর ভাষার বিপরীতে বিশ্বের মানুষ যেন শান্তি, ন্যায্যতা ও মানবিকতার সুস্পষ্ট বার্তা পায়—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন ড. ইউনূস। তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান ছাড়াও তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট ও ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের বন্ধু জোসে রামোস-হোর্তা উপস্থিত ছিলেন। ব্রাজিলের মন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর ও সামাজিক ব্যবসার বিস্তার
ড. ইউনূস তার বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছরের যাত্রা এবং সামাজিক ব্যবসার আন্তর্জাতিক বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তুলে ধরেন, কীভাবে সামাজিক ব্যবসার ধারণা বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’র কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পৌঁছে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ সফলতার রেকর্ড রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তার বক্তব্যে ক্ষুদ্রঋণকে কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উদ্যোগ, আত্মনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
স্বাস্থ্যসেবায় সামাজিক ব্যবসার উদাহরণ
বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার কাঠামোর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণও তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস।
তিনি জানান, দেশে সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টেলিমেডিসিন নেটওয়ার্ক এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্ষু হাসপাতাল এ ধরনের কার্যক্রমের উদাহরণ। এসব প্রতিষ্ঠানের আয় পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ড. ইউনূসের বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসার এমন একটি মডেলের ধারণা উঠে আসে, যেখানে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ব্যক্তিগত লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও মানুষের সেবায় ব্যবহার করা হয়।
স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করবে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’
অনুষ্ঠানের শেষভাগে নতুন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি জানান, আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মূলত চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলার প্রবণতার বাইরে গিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার যোগ্যতা ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেবে বলে জানান তিনি।
ড. ইউনূসের উপস্থাপিত পরিকল্পনায় তিনটি লক্ষ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
- শূন্য দারিদ্র্য: দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে কাজ করা।
- শূন্য বেকারত্ব: তরুণদের উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তোলা।
- শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ: পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য অর্জন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, বরং বাস্তব সমস্যা সমাধান ও নতুন উদ্যোগ তৈরির সক্ষমতা নিয়ে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের সহযোগিতা চাইলেন ইউনূস
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে সম্মিলিত উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান অধ্যাপক ইউনূস। সামাজিক ব্যবসা, প্রযুক্তি ও তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
এ জন্য উপস্থিত বিশ্বনেতাদের সমর্থন কামনা করেন ড. ইউনূস। তার বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসার অভিজ্ঞতা, স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা একই ধারায় উঠে আসে।
জাতিসংঘের মঞ্চে দেয়া বক্তব্যে একদিকে তিনি আগের ছোট পরিসরের আয়োজনের স্মৃতি তুলে ধরেন, অন্যদিকে সামাজিক ব্যবসার ভবিষ্যৎ বিস্তার ও তরুণদের জন্য নতুন শিক্ষার কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ফলে অনুষ্ঠানটি সামাজিক ব্যবসা নিয়ে আলোচনা এবং ভবিষ্যৎমুখী উদ্যোগের ঘোষণা—দুই দিক থেকেই গুরুত্ব পায়।
সবার দেশ/এমকেজে




























