রংপুর চিড়িয়াখানায় হরিণের হিসাবে গরমিল
বিক্রি ও মৃত্যুর হিসাব বাদ দিয়েও কম ৩টি, কোথায় গেলো হরিণ?
রংপুর বিনোদন উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় হরিণের সংখ্যার হিসাবে গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। বিক্রি ও মৃত্যুর হিসাব বাদ দেয়ার পর চিড়িয়াখানায় ৫৮টি হরিণ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৫৬টি। ফলে হিসাব অনুযায়ী ৩টি হরিণের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে।
চিড়িয়াখানা সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগের বছর রংপুর চিড়িয়াখানায় হরিণের সংখ্যা ছিলো ৬২টি। চলতি অর্থবছরে সরকার নির্ধারিত মূল্যে দুটি হরিণ বিক্রি করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি হরিণ মারা গেছে। সে হিসাবে ৬২টি থেকে তিনটি বাদ দিলে বর্তমানে হরিণ থাকার কথা ৫৯টি। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে বিক্রি ও মৃত্যুর হিসাবের সময়কাল এবং মোট সংখ্যায় অসামঞ্জস্য রয়েছে। চিড়িয়াখানার বর্তমান গণনায় পাওয়া যাচ্ছে ৫৬টি হরিণ।
ফলে প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে হরিণের জন্ম, মৃত্যু, বিক্রি, স্থানান্তর ও হস্তান্তরের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুই বেষ্টনীতে ৫৬ হরিণ
বর্তমানে রংপুর চিড়িয়াখানায় থাকা ৫৬টি হরিণকে দুটি বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক হরিণ রাখায় সেখানে গাদাগাদি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রাণীগুলো স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারছে না। একই সঙ্গে হরিণের খাবার নিয়েও সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে।
চিড়িয়াখানার প্রাণীদের কল্যাণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা, খাবার ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে প্রাণীদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজননও ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন প্রাণীপ্রেমীরা।
তিন হরিণ কোথায়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হিসাবের গরমিল নিয়ে। বিক্রি ও মৃত্যুর হিসাবের পর নির্ধারিত সংখ্যার সঙ্গে বর্তমান সংখ্যার পার্থক্য কেন—তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কারও কারও অভিযোগ, গোপনে হরিণ জবাই করে খেয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, চিড়িয়াখানা থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বেশি দামে হরিণ অন্যত্র বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে হরিণ জবাই করে খাওয়া কিংবা অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গত ১০ বছরে বিক্রি প্রায় ৪০টি
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে আনুমানিক ৪০টি হরিণ বৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে। তবে এর বাইরে অবৈধভাবে কতটি হরিণ স্থানান্তর বা বিক্রি হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানা গেছে।
এ কারণে চিড়িয়াখানার হরিণের জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ হিসাব, বিক্রির অনুমোদন, ক্রেতার পরিচয়, হস্তান্তর নথি এবং মৃত্যুর রেকর্ড প্রকাশের দাবি উঠেছে।
নির্দিষ্ট শর্তে হরিণ বিক্রি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় চিড়িয়াখানার হরিণ ও ময়ূর বিক্রির অনুমোদন দিয়ে থাকে। তুলনামূলকভাবে এসব প্রাণীর লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হওয়ায় নির্দিষ্ট শর্তে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছে এগুলো হস্তান্তর করা হয়।
হরিণ বিক্রির ক্ষেত্রে সাধারণত নারী-পুরুষ জোড়া হিসেবে প্রাণী নেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি বন্য প্রাণী লালন-পালনের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমোদন বা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট অনুমোদন থাকা ব্যক্তির কাছেই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ প্রাণী হস্তান্তর করতে পারে।
এসব প্রাণী মূলত লালন-পালনের উদ্দেশ্যে দেয়া হয়। কোনো অবস্থাতেই এগুলো পাচার, শিকার কিংবা খাওয়ার জন্য ব্যবহার করার সুযোগ নেই।
‘হরিণের হিসাবে গরমিলের সুযোগ নেই’
তবে হরিণের সংখ্যা নিয়ে কোনও ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রংপুর চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. এইচ এম শাহাদত।
তিনি বলেন, হরিণের হিসাবে গরমিলের কোনও সুযোগ নেই। খাঁচায় প্রদর্শনের জন্য যে পরিমাণ হরিণ প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি হরিণ থাকলেও এ নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি।
তবে বর্তমান সংখ্যা ও অতীতের হিসাবের মধ্যে যে পার্থক্যের কথা উঠেছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কী—এ প্রশ্নের উত্তর পেতে চিড়িয়াখানার সংরক্ষিত নথি, প্রাণীর জন্ম-মৃত্যু রেজিস্টার, বিক্রির অনুমোদন এবং হস্তান্তর সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
প্রাণীপ্রেমীদের দাবি, চিড়িয়াখানার প্রতিটি প্রাণীর জন্য পৃথক ও হালনাগাদ রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং নিয়মিত শারীরিক গণনা করা হলে এ ধরনের প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমে যাবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তও প্রয়োজন।
সবার দেশ/কেএম




























