Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০৭:৩৫, ১০ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০৭:৩৮, ১০ আগস্ট ২০২৬

যেভাবে বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ছবি: সবার দেশ

আজকের (চতুর্থ) পর্বে থাকছে—কার্জন হলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম কীভাবে সামনে আসে, তার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ, বিএনপি-জামায়াতের ভূমিকা এবং প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নেপথ্যের বিস্তারিত।

(চতুর্থ পর্ব)

৫ আগস্টের রাত গড়িয়ে ৬ আগস্ট। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রাজপথে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস থাকলেও প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে—দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন কে?

রাজনৈতিক দল, ছাত্রনেতৃত্ব, সেনাবাহিনী এবং সুশীল সমাজ—সব পক্ষই তখন একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজছিলো। সে সন্ধানই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে।

কার্জন হলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক

৬ আগস্ট রাত প্রায় ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় ছাত্রনেতাদের খুঁজে পান অধ্যাপক আসিফ নজরুল।

সারাদিনের টানা ঘটনাপ্রবাহের পরও তখন তাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নির্ধারণ করা।

বর্তমান সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম অধ্যাপক আসিফ নজরুলের কাছে জানতে চান, সম্ভাব্য নতুন সরকারের কাঠামো কেমন হতে পারে।

জবাবে আসিফ নজরুল তাদের পরদিন বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানান।

সে বৈঠকেই প্রথমবারের মতো সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ছাত্র প্রতিনিধিকে সরকারে নেয়ার প্রস্তাব

আলোচনার একপর্যায়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রস্তাব করেন, নতুন সরকারে একজন ছাত্র প্রতিনিধি রাখা যেতে পারে।

কিন্তু উপস্থিত ছাত্রনেতারা সে প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন।

তাদের যুক্তি ছিলো, আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও তারা সরাসরি সরকারে যুক্ত হতে চান না। বরং এমন একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা প্রয়োজন, যিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত। এ অবস্থান পরবর্তী সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।

কে হবেন সরকারপ্রধান?

এরপরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি—অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন?

অধ্যাপক আসিফ নজরুল পরে জানান, তিনি কয়েকজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বের উদাহরণ তুলে ধরেন। তার মতে, এমন একজন ব্যক্তিকে প্রয়োজন ছিলো, যিনি সংকটকালে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাখেন এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেন।

কিন্তু ঠিক তখনই আলোচনায় আসে আরেকটি নাম। নাহিদ ইসলাম প্রস্তাব করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেয়া উচিত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে।

আগেই শুরু হয়েছিলো যোগাযোগ

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামটি হঠাৎ করেই সামনে আসেনি। ছাত্রনেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকার পতনের কয়েক দিন আগেই এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিলো।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, ১ আগস্ট ছাত্রনেতারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সহযোগিতা চান। ড. বদিউল আলম বলেন, তিনি ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেন, যাতে ছাত্রনেতারা সরাসরি তাদের অবস্থান জানাতে পারেন।

২ আগস্টের যোগাযোগ

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, ২ আগস্ট তিনি ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখনও সরকার পতনের বিষয়টি নিশ্চিত ছিলো না।বরং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিও অনিশ্চিত ছিলো।

তবে ছাত্রনেতারা মনে করছিলেন, যদি সরকারের পতন ঘটে, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আগেভাগেই একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।

৩ আগস্টের ফোনালাপ

পরদিন ৩ আগস্ট ড. ইউনূসের সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলার সুযোগ হয়। আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের খবর নিয়মিত অনুসরণ করায় ড. ইউনূস তাকে চিনতে পারেন। সে সময় অসহযোগ আন্দোলনের বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন জানান ড. ইউনূস।

কথোপকথনের একপর্যায়ে ছাত্রনেতারা তাকে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি শুরুতে রাজি হননি। বরং অন্য কাউকে খুঁজে নেয়ার পরামর্শ দেন।

দ্বিতীয় কোনও বিকল্প ছিলো না

আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রনেতারা তখন মনে করেছিলেন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জাতীয় আস্থার বিচারে ড. ইউনূসের বিকল্প খুব কমই ছিলো। তাই তারা তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যান।

তিনি জানান, এ প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বকেও অবহিত করা হয়েছিলো। দুই দলই এতে নীতিগতভাবে সম্মতি জানায় বলে তিনি দাবি করেন। তবে আসিফ মাহমুদের বক্তব্য, ড. ইউনূসের নামটি প্রথমে ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকেই প্রস্তাব করা হয়েছিলো।

৫ আগস্টের দ্বিতীয় ফোন

শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টা পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ছাত্রনেতারা আবারও ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিস্থিতি তখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া কার্যকর কোনও রাজনৈতিক নির্বাহী কর্তৃত্ব আর অবশিষ্ট নেই। দেশজুড়ে প্রশাসনিক শূন্যতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতায় ড. ইউনূসের কাছে আবারও নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবার তিনি আগের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক মনোভাব দেখান। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ধরে একাধিক দফা আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত তিনি নীতিগতভাবে দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা

একই রাতে ছাত্রনেতারা লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। সেখানে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রাথমিক ধারণা ছিলো, রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমান অংশগ্রহণে একটি বৃহৎ জাতীয় সরকার গঠন করা যেতে পারে। তবে বিএনপি অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পক্ষে মত দেয়।

পরবর্তী আলোচনায় সাত সদস্যের একটি সম্ভাব্য কাঠামো নিয়েও মতবিনিময় হয়। যদিও পরে বাস্তবতা বিবেচনায় সে কাঠামোয় পরিবর্তন আসে।

নতুন দিনের অপেক্ষা

৬ আগস্টের সকাল শুরু হয় নতুন প্রত্যাশা নিয়ে। ছাত্রনেতারা বঙ্গভবনে যাবেন। রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসবেন।

সে বৈঠকেই নির্ধারিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব, কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পরবর্তী রূপরেখা। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন অধ্যায়।

(চলবে)

পরবর্তী (পঞ্চম ও শেষ) পর্বে থাকবে—বঙ্গভবনে ছাত্রনেতাদের পাঁচ ঘণ্টার বৈঠক, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া, উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথের পূর্ণ বিবরণ।

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:

এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ
হেফাজতের নিষিদ্ধের দাবি অগণতান্ত্রিক ও অন্যায্য: হেযবুত তওহীদ
দাবানল নেভাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, ২ পাইলট নিহত
বন্ধু হলে বাংলাদেশের কিলারকে আশ্রয় দিয়েছেন কেনো?—ভারতের উদ্দেশে জামায়াত আমিরের প্রশ্ন
কাজী জেসিনের নিয়োগে ত্রুটি, প্রজ্ঞাপন সংশোধনের সিদ্ধান্ত
কসোভোর প্রধানমন্ত্রীকে ডিম ছুড়লেন বিরোধী আইনপ্রণেতা
‘গুপ্তবাহিনী’ আবারও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, জনগণই ব্যবস্থা নেবে: প্রধানমন্ত্রী
অলি আহমদকে প্রার্থী করে জামায়াতের বড় রাজনৈতিক বার্তা
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভব
রোনালদোর বিয়ের গুঞ্জনে ভক্তদের হুলুস্থুল!
সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির প্রাণহানি
আলেমদের সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত
হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মানা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পথ নেই: ইরান
প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও জিয়া নেই কেনো—জবাব দিলেন জামায়াত আমির
দক্ষিণ সুদান ও আবেইতে ৫ দিনের সফরে সেনাপ্রধান
বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির খবর ‘অসত্য ও কাল্পনিক’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মাঠে জামায়াত, রোববার চূড়ান্ত হবে প্রার্থী
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভব