Sobar Desh | সবার দেশ বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২:৫৮, ৮ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০৩:০৪, ৮ আগস্ট ২০২৬

অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু

‘৫ আগস্ট প্রাণনাশের শঙ্কায়ও দায়িত্বে ছিলাম’

সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতা নিতে চায়নি। ইউনূসকে নিয়ে প্রথম বৈঠক হয় বিমানবন্দরে। জীবনহানির আশঙ্কা সত্ত্বেও দায়িত্বে ছিলাম। শাসকগোষ্ঠী ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। উপদেষ্টাদের তালিকা প্যারিস থেকে এনেছিলেন ড. ইউনূস। জীবনে এখন ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই।

‘৫ আগস্ট প্রাণনাশের শঙ্কায়ও দায়িত্বে ছিলাম’
ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগের চার দিন আগে, তখনকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু একটি দীর্ঘ লিখিত সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন।

দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই লিখিত প্রশ্নের ভিত্তিতে দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিনিধি সাঈদ আহমেদকে সাক্ষাৎকারটি দেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এটি ১৯ জুলাই প্রকাশের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশিত হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাক্ষাৎকার প্রকাশের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে এলে পত্রিকাটির বার্তা বিভাগকে তা প্রকাশ না করার নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের মতে, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. সাহাবুদ্দিনের চুপ্পুর দিল্লিতে ফোনালাপ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর কাউকে না জানিয়ে এমন একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেয়ায় সরকারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর ২৪ জুলাই তার পদত্যাগের ঘোষণা আসে।

সবার দেশের হাতে আসা ওই অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের সময় তিনি প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণে আগ্রহী ছিলো না। বরং একটি সাংবিধানিক সমাধানের পথ খুঁজতে তারা ভূমিকা রেখেছিলো।

সাক্ষাৎকারে তিনি আরও দাবি করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্যারিস থেকে ঢাকায় ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিন বাহিনীর প্রধান উপস্থিত ছিলেন এবং কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

মো. সাহাবুদ্দিনের দাবি, ওই বৈঠকেই ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাব্য উপদেষ্টাদের একটি তালিকা তিন বাহিনীর প্রধানের কাছে হস্তান্তর করেন, যা তিনি প্যারিস থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। পরে সে তালিকা অনুযায়ীই সরকার গঠন করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ ভয়াবহ সাংবিধানিক সংকটে পড়ে। সে পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো।

এ ছাড়া তিনি মন্তব্য করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলো। একই সঙ্গে তিনি সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং দেশে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে তাদের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বলেন, জীবনে তার এখন আর কোনও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই।

উল্লেখ্য, উপরের তথ্য ও বক্তব্যগুলো মো. সাহাবুদ্দিনের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারে করা দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

প্রশ্ন: চব্বিশের জুলাই অভ্যুথানের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে কিভাবে দেখছেন?

উত্তর: ২০২৪ সালে সরকারী চাকরীতে কোটা বিরোধী আন্দোলন পরবর্তীতে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক ও টেকসই পরিবর্তনের আকাঙ্খা ব্যক্ত করা হয়। আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ই আগস্ট ২০২৪ ক্ষমতা ছেড়ে দেশান্তরিত হলে স্বাভাবিক নিয়মে সরকারের পতন ঘটে। আমি তখন সাংবিধানিক পন্থায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। দেশে সরকারের অস্থিত্ব না থাকায় ভয়াবহ ব্যতিক্রমী সংকটের সৃষ্টি হয়। এ মহাসংকটকালে দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী সংকট নিরসনের জন্য রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করে। তথনকার পরিস্থিতিতে আমার জীবনহানির আশঙ্কা ছিলো, তা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালন থেকে আমি বিরত থাকিনি। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও জোট আমার পাশে অবস্থান নেয়ায় আমার ভিত আরো শক্তিশালী হয়েছিলো। ৫ই আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আমি নিতামিতভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্রের কল্যাণে সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা ধরে রেখেছিলাম। ওই রকম একটা পরিস্থিতিতে আমি দেশে সাংবিধানিক কোনও বিপর্যয় ঘটতে দেইনি।

প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তখন আপনাকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলো। এ বিষয়ে আপনি কি ভূমিকা
রেখেছিলেন?

উত্তর: ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলনকারী ছাত্ররা ১৪/০৭/২০২৪ তারিখে বঙ্গভবনে এসে আমার কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলো। স্মারকলিপি প্রাপ্ত হয়ে আমি স্মারকলিপির একটি কপি সরকারের পর্যালোচনার জন্য দ্রুত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে দেই এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করি। তখন আমাকে জানানো হয় যে, প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দের সাথে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আন্দোলনকারীদের দাবিগুলোর অনেক কিছুই আলেচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য ছিলো। আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে সমঝোতার পথ খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আমার পক্ষে এ বিষয়ে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রশ্ন: সে ক্ষেত্রে আপনার উপলব্ধি কী ছিলো এবং কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

উত্তর: জুলাই আন্দোলনের সময় প্রাণহানির ঘটনা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো। চারিদিকে রক্ত ঝরছিলো। সে দৃশ্য ছিলো ভয়ংকর। শাসকগোষ্ঠী এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে আন্দোলনের মুখে ৫ আগষ্ট ২০২৪ তৎকালিন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশান্তরিত হন। সে পরিস্থিতিতে দেশে চরম সাংবিধানিক সংকট শুরু হলে সশস্ত্র বাহিনী আমার নেতৃত্বে সংকট মোকাবেলায় এদিয়ে আসে। ওই সময়ে আমি ০৬/০৮/২০২৪ তারিখ পূর্বাহ্নে মাত্র ২/৩ ঘন্টার মধ্যে আমার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে বেগম খালেদা জিয়াসহ দুই হাজারের বেশি রাজবন্দীর মুক্তি দিয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার সূচনা করি। উল্ল্যেখ্য যে, পরবর্তী সময়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বেগম খালেদা জিয়াকে নির্দোষ গণ্য করে খালাসের আদেশ প্রদান করেন। দেশে সরকার নেই, প্রধানমন্ত্রী নেই, মন্ত্রিসভা নেই, সংসদ নেই। এমন এক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা, সাংবিধানিক ধারা বজায় রাখা এবং একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ নিশ্চিত করা ছাড়া আমার সামনে অন্য কোনও বিকল্প পথ ছিলো না।

প্রশ্ন: ৫ই আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনি রয়ে গেলেন। এর কারন কী?

উত্তর: ৫ই আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি সরকার পতনই হয় নাই, দেশে গভীর সংকটেরও সূচনা হয়েছিলো। তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী দেশ ত্যাগের পর আইনগতভাবে মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরে সংসদ ভেঙে দেয়ার পর কার্যত নির্বাচিত সরকারের আর কোনও সাংবিধানিক অস্থিত্ব অবশিষ্ট ছিলো না। দেশ তখন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে ছিলো। সরকারের দৃশ্যমান কাঠামোর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ছাড়া আর কোনও পথ ছিলো না। তখন যদি সশস্ত্রবাহিনী ও আমি দায়িত্ব না নিতাম তা হলে রাষ্ট্রীয় শূন্যতা আরো গভীর হতো। তখন কি হতো তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।

প্রশ্ন: ওই রকম উত্তাল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের আশঙ্কা করছিলেন অনেকে। অথচ তারা সেটি করেনি। কি ঘটেছিল আসলে?

উত্তর: তখনকার সময় চরম সংকটকালে সশস্ত্র বাহিনী কখনোই অসংবিধানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ খোঁজে নাই বা
চিন্তাও করে নাই। বরং তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রুত নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো। সেনাবাহিনীর অবস্থান ছিলো পরিষ্কার, দেশকে গণতান্ত্রিক পথে সামনে এগোতে হবে। নির্বাচন হবে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামানসহ নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনী প্রধানগণ আমাকে বলেছিলেন, আপনি স্যার সহযোগিতা করুন, আমরা রাষ্ট্রকে নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন ছিলো একটি অন্তর্বতী সরকার। এ সরকার গঠন ও সংকট নিরসনের উপায় খুঁজতে গিয়ে বঙ্গভবনে আমার সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবন্দ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও আন্দোলনকারী ছাত্র নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ৫ ও ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সভ্য অনুষ্ঠিত হয়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামান উন্ড সভা পরিচালনা পরিচালনা করেন। উপস্থিত নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে আমার ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পুরো প্রত্রিয়া ছিলো আলোচনা নির্ভর। সরকার গঠনে কোনও একক সিদ্ধাত্ব ছিলো না। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনাও পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্যারিসে অবস্থানরত প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় এবং আলোচনা হয় প্রফেসর ড. মুহাম্ম ইউনুসের সঙ্গে পরামর্শক্রমে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। সময়ক্ষেপণ না করে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস প্যারিস থেকে দেশে ফেরার সময়ই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের 'ভিভিআইপি লাউঞ্জে সেনাবাহিনী প্রধান, বিমান বাহিনী প্রধান এবং নৌবাহিনী প্রধান মিলিত হলেন এবং তার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে উপদেষ্টা পরিসদের সম্ভাব্য নাম চূড়ান্ত করা হয় মর্মেও সিঙ্গান্ত গৃহিত হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ০৮/০৮/২০২৪ তারিখ সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকার ভিভিন্নাইপি লাউঞ্জে বৈঠকে বসে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সদ্য মনোনীত প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস তার উপদেষ্টাদের নাম চূড়ান্ত করার কথা জানান। আসলে তিনি প্যারিস থেকে আসার সময় উপদেষ্টাদের একটি তালিকা তৈরি করে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। কারও সাথে তখনও তার আলোচনাই হয়নি। তাদের বিমানবন্দরের বেঠক শেষ করার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাফতরিক পদ্ধতিতে সংবিধানের অনুচ্ছে ৫৬ (২) এর বিধানমতে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাদেরকে নিয়োগ প্রদান করি। তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে তা প্রেরণ করে শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

প্রশ্ন: অস্থির ওই মুহূর্তে সুপ্রিমকোর্টের রেফারেন্স নেয়ার চিন্তা এলো কীভাবে?

উত্তর: আমাদের সংবিধানের ৭, ৭ (খ) অনুচ্ছেদ তথা সংবিধানের প্রাধান্য, বাতিল বা স্থগিতকরণ, সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধনের অযোগ্য বিধানসমূহের প্রতি দৃষ্টি রেখে ক্রান্তিলগ্নে উদ্ভুত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হয়েছিলাম। সে পথ খুঁজতে গিয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৬ এ বর্ণিত সুপ্রিম কোর্টের উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার সংক্রান্ত বিধানের আশ্রয় গ্রহণ করা সঙ্গত হবে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়। পরিস্থিতি যখন প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে চলে যেতে উদ্ধৃত হয় তখন আমি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ওই রকম একটা সময়ে আমাকে কেউ এ পথ দেখায়নি। আইন ও বিচার অঙ্গনে আমার ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। আমি নিজেই সংবিধানের আওতায় থাকা এ পথ বেছে নিয়েছি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আমি রেফারেন্স পাঠাই। যা রেফারেন্স ১/২০২৪ নম্বরে নিবন্ধিত হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ০৬/০৮/২০২৪ তারিখে এ মর্মে পরামর্শ প্রদান করেন যে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এর বক্তব্য শোনা হলো। এমতাবস্থায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কোনও বিধান না থাকায় উল্লিখিত প্রশ্নের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ মতামত প্রদান করছে যে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরী প্রয়োজনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্ত অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির উক্তরূপে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাগণকে শপথ পাঠ করতে পারবেন।

আপিল বিভাগের উক্তরূপ মতামত পাওয়ার পর আমি নিশ্চিত হই যে, রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয়তা মতবাদ অর্থাৎ অপরিহার্যতার নীতি (Doctrine of Necessit), বিশেষত রাজনৈতি প্রয়োজনীয়তার (Political Necessity) উপাদানও তখন বিদ্যমান ছিলো। একই সঙ্গে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের ফলে প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি তৈরি হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। এক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গণ্য করা যায়। রাষ্ট্রের একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতে রাষ্ট্রপতিকে ভৎসময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো। সেনাশৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ, সংসদ ভেঙে দেয়াসহ প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ প্রধান উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগ এবং তাদের শপথ এমন সব কিছুই রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছিলো। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অর্থাৎ বর্তমান ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা অর্থাৎ বর্তমান ক্ষেত্রে মন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত হয়।

উপদেষ্টাদের শপথ, ১৩৩ অধ্যাদেশ জারি এবং বর্তমান বিতর্ক প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ও তার সুপারিশের ভিত্তিতে অন্য উপবেষ্টানের দাফতরিক পদ্ধতিতে নিয়োগ দিলাম আমি। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযারী তাদের শপথও পড়ালাম আমি। রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য যা যা প্রয়োজন ছিলো তার সবই তো রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমাকেই করতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সকল নির্বাহী ব্যবস্থা সংবিধানেলর ৫৫৪৪) অনুচ্ছেদের বিধান মোতাবেক রাষ্ট্রপতির নামেই গৃহিত হয়েছে এবং তদরূপেই প্রকাশিত হয়েছে। অন্তর্বতী সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো টেকসই পরিবর্তনসহ বিবিধ বিষয়ে সংস্কারের নিমিয় একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছিলো। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশসমূহ 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংক্ষত) বসন্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' নামে গৃহিত হয়। যে অনুযায়ী গণভোট অধ্যাদেশ ও জুলাই ঘোড়া সুরক্ষা অধ্যাদেশও বসরা হয়েছিলো। উভয় অধ্যাদেশ সংবিধানের ১৩/১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমার স্বাক্ষরে জারি করা করা হয়। আমি ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে ১৮ মাস অন্তর্বতী সরকারকে আইনত: সরকার পরিচালনার
পথ সুগম করে দিয়েছি।

তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য আইনগত বৈধতার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনকে প্রয়োজনীয় মনে করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা ঐকমত্য কমিশনের সভায় মত দিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর এ প্রত্রিয়াকে আইনগত ভিত্তি দেবে। পরে উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উক্ত আদেশ স্বাক্ষরের জন্য মূখ্য সচিব ও আইন সচিব নথি নিয়ে আমার কাছে আসেন এবং আমাকে স্বাক্ষর দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং জানান যে আমার স্বাক্ষরের পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ চূড়ান্ত হবে এবং জারি করা হবে। উক্ত দুই কর্মকর্তা আরো বলেন যে, এ ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা কিছুক্ষণের মধ্যেই জাতির উদ্দেশে সাধারণ নির্বাচনকেন্দ্রিক ভাষণ দিবেন বিধায় আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শমতে আমি যেনো চূড়ান্ত স্বাক্ষর করি। গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার স্বার্থে ১৩/১১/২০২৫ তারিখে আমি উক্ত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এ স্বাক্ষর করি।

আমি এখন সবচাইতে বড় রাজনৈতিক বৈপরীত্য লক্ষ্য করছি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের দাফতরিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি নিয়োগ দিলাম, আমার কাছেই শপথ নিলেন, আমার স্বাক্ষরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলো। যে সনদ নিয়ে এখন সরকার ও বিরোধী রাজনীতি সরব হচ্ছে সেটার চূড়ান্ত অনুমোদনও আমিই দিয়েছি। এখন আমার প্রশ্ন, তাহলে আমি হঠাৎ কোনো বিতর্কের সম্মুখিন হবো? এটাই এখন আমার কাছে সবচাইতে বড় বিস্ময় মনে হয়। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর বাস্তবায়ন প্রশ্নে সংসদে আলোচনা চলছে। উচ্চ আদালতেও বিষয়টি বিচারাধীন আছে বলে জেনেছি। রাজনীতির মাঠেও বর্তমান জুলাই সনদ সর্বোচ্চ আলোচনার বিষয়বস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন: চব্বিশের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে যা কিছু হয়েছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সব আপনারই স্বাক্ষরে। সবাই সেটি মেনেও নিয়েছে। অথচ এখন বিতর্ক হচ্ছে কেনো?

উত্তর: ৫ই আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদটি কার্যকর না থাকলে বা সংবিধান বহির্ভূত রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হলে দেশে গভীর সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হতো। আমি রাষ্ট্রপতি না থাকলে বৈধভাবে সরকার গঠন হতো না। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ভেঙে যেতো। নির্বাচন পর্যন্ত পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে যেতো। আমি যা করেছি তা দেশের স্থিতিশীলতা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের স্বার্থেই করেছি। রক্তপাত এড়িয়ে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়াই ছিলো আমার প্রধান লক্ষ্য ও দায়িত্ব। আমার জীবনে এখন আর ব্যক্তিগত কোনও চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই।

আমার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক আক্রমণ চলতেই পারে। তবে ইতিহাস একদিন সবকিছুর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করবে। আমি যা করেছি তা রাষ্ট্রের স্বার্থে, সংবিধানের স্বার্থে এবং দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে। গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। সরকার ও বিরোধীদল নিজ নিজ দলের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে তর্ক বিতর্কের মাধ্যমে তাদের মহান দায়িত্ব পালন করছেন। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় সফলতা আসুক এ কামনা করি।

সবার দেশ/কেএম

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

৫ আগস্ট প্রাণনাশের শঙ্কায়ও দায়িত্বে ছিলাম: সাহাবুদ্দিন চুপ্পু
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ভারতীয় হাইকমিশনকে তলবের দাবি নাহিদ ইসলামের
বিয়ের খাবার নিয়ে বর ও কনেপক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক করলো পুলিশ
বিএনপি আইসিইউতে গেলে আমি বাঁচাই: রুমিন ফারহানা
ইতালি বিমানবন্দরে ২৬০ যাত্রী নিয়ে আটকা ঢাকাগামী বিমান
হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরতে চান সাকিব
মিরপুরে বিএনপি নেতাকে গুলি করলো যুবলীগ
পাকিস্তানে বাংলাদেশের আনারস রফতানির দ্বার উন্মুক্ত
নরসিংদীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
সরকারের ব্যর্থতায় দিল্লিতে প্রেস ব্রিফিং করেছেন হাসিনা: নাহিদ
বোমা হামলার শঙ্কায় দেশজুড়ে পুলিশের হাই অ্যালার্ট
ইয়েমেনে সেনা সমাবেশে হুতিদের হামলায় নিহত ৫৮
সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের প্রাণহানি
বগুড়ায় বাসচাপায় ৬ শ্রমিক নিহত, আহত ১৫
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন