সচিবালয় স্থানান্তরে ৩৫০০ কোটি টাকা ব্যয়, প্রশ্ন যৌক্তিকতা নিয়ে
সচিবালয় বর্তমান অবস্থান থেকে আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার দাবি উঠেছে। প্রস্তাবিত স্থানান্তরে সম্ভাব্য ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা কতটা যুক্তিসংগত। বিশেষ করে বর্তমান সচিবালয়ে নির্মিত নতুন ভবনগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত না করেই নতুন স্থানে প্রশাসনিক কার্যক্রম সরিয়ে নেয়া হলে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসার পর সম্ভাব্য ব্যয়, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও সাজসজ্জা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থানান্তরের সামগ্রিক খরচ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আধুনিক ও কার্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি হলেও সে ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ, আর্থিক সক্ষমতা এবং বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাব্যতা যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক সংকটে বাড়তি ব্যয়ের চাপ
দেশের অর্থনীতি যখন নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সচিবালয় স্থানান্তরের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। প্রস্তাবিত স্থানান্তরে যদি সত্যিই ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়, তবে সে অর্থের উৎস কী, কোন খাতে কত টাকা খরচ হবে এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করলে কী ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
দেশের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর থেকে। আয়কর, মূল্য সংযোজন করসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ দিয়ে সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ভবন স্থানান্তরের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা, সরকারি ঋণের চাপ এবং অর্থনীতির অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকিং খাত পরিচালনা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা এবং সরকারি দায় পরিশোধের মতো বিষয়গুলোও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্ভাব্য অর্থায়ন বা আগামী কয়েক বছরের আর্থিক দায়ের বিষয়ে নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ করা হলে তার পক্ষে সরকারি নথি ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি।
বিগত সরকারের সময়ে দেশ থেকে অর্থ পাচার এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এসব কারণে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের আর্থিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার প্রয়োজন। এ অবস্থায় নতুন কোনো বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে তার অর্থনৈতিক সুফল ও বিকল্প ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বর্তমান ভবনগুলো ব্যবহার হচ্ছে কতটা?
সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, বর্তমান সচিবালয়ের অবকাঠামো পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। সেখানে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবনের সাজসজ্জা ও অভ্যন্তরীণ কাজও বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
নতুন ভবন নির্মাণে ইতোমধ্যে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকলে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত না করে নতুন স্থানে প্রশাসনিক কার্যক্রম সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। বিদ্যমান ভবনগুলোতে কতটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, কতটুকু জায়গা অব্যবহৃত রয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে কত অর্থ লাগবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
নতুন স্থানে সচিবালয় গড়ে তুলতে শুধু জমি বা ভবনের খরচই বিবেচনায় নেয়া যথেষ্ট নয়। দফতর স্থানান্তর, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মুদ্রণ ও অনুলিপি যন্ত্র, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্যও অর্থ ব্যয় হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ অনুযায়ী কক্ষ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দফতরের কার্যক্রম সচল রাখার জন্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়া নতুন স্থানে যাতায়াত, পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় নয়, ভবিষ্যতে নিয়মিত পরিচালনার খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।
ঋণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কতটা যুক্তিসংগত?
বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অর্থের পাশাপাশি ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় করা হবে এবং সে ব্যয়ের বিনিময়ে রাষ্ট্র কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি। ঋণ নিয়ে কোনও প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই সেটি অযৌক্তিক হয়ে যায় না; বরং প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক লাভ, বিকল্প ব্যবস্থা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
সচিবালয় স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত নতুন স্থানে গেলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় কী ধরনের সুবিধা বাড়বে, বর্তমান স্থানের সীমাবদ্ধতা কতটা গুরুতর এবং সেগুলো সংস্কার বা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব কি না—এসব বিষয় তুলনামূলক সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।
যদি বর্তমান সচিবালয়ের ভবনগুলো সংস্কার, আধুনিকায়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য রাখা সম্ভব হয়, তবে নতুন স্থানে স্থানান্তরের বিপুল ব্যয় এড়ানো যেতে পারে। অন্যদিকে বর্তমান স্থানে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, জায়গার সংকট বা অন্য কোনো মৌলিক সমস্যা থাকলে সেগুলোর প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন প্রকাশ করা দরকার।
জনগণের আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, জনগণের আর্থিক অবস্থাও বিবেচনায় নেয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যে অর্থ সচিবালয় স্থানান্তরে ব্যয় করা হবে, তা দিয়ে অন্য কোন কোন জরুরি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নেয়া দরকার। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন থাকলে সেসব খাতের সঙ্গে প্রকল্পটির অগ্রাধিকার তুলনা করা উচিত।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হলো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখা। কোনো প্রকল্প প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও তার ব্যয় যদি বিদ্যমান প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হয়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে দেখা বিচক্ষণতার পরিচয়।
স্থানান্তরের আগে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার দাবি
সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে প্রস্তাবিত ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব, অর্থের উৎস, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য সুফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমান সচিবালয়ের ভবনগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা, নির্মাণাধীন ও অসমাপ্ত কাজের অবস্থা এবং সেগুলো সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাবও সামনে আনা উচিত।
একটি নিরপেক্ষ ব্যয়-সুবিধা সমীক্ষার মাধ্যমে বর্তমান সচিবালয় আধুনিকায়ন এবং আগারগাঁওয়ে নতুন করে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থানান্তরের সম্ভাব্য ব্যয় তুলনা করা যেতে পারে। এতে কোন বিকল্পটি রাষ্ট্রের জন্য বেশি সাশ্রয়ী, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
প্রশাসনিক কার্যক্রম আধুনিকায়নের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সে লক্ষ্য অর্জনে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান অবকাঠামো যথাযথভাবে ব্যবহার না করে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় করার আগে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সব দিক বিবেচনায় সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবটি এখনই বাস্তবায়ন না করে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবি উঠতে পারে। প্রথমে বর্তমান সচিবালয়ের নতুন ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কাজ শেষ করে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। এরপরও স্থানান্তরের প্রয়োজন থাকলে স্বচ্ছ ব্যয় পরিকল্পনা, আর্থিক সক্ষমতা এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।
রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। তাই প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সে অর্থের প্রতিটি ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা সরকারের দায়িত্ব। সচিবালয় স্থানান্তরের মতো বড় সিদ্ধান্তেও এ নীতির ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























