হামে মৃত্যুর অর্ধেকেরই টিকা নেয়ার বয়স হয়নি
দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তারের মধ্যে শিশু মৃত্যুর একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি তথ্য বলছে, হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেকেরই বয়স ছিলো নয় মাসের কম— অর্থাৎ তারা এখনও নিয়মিত টিকা নেয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। এতে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) ২১টি জেলা থেকে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া ৬০ শিশুর মধ্যে ২৯ জনের বয়স ছিলো নয় মাসের নিচে। এর মধ্যে ১৫ শিশুর বয়স ছিলো মাত্র ছয় মাস বা তারও কম। সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটির বয়স ছিলো তিন মাস, আর সবচেয়ে বড় শিশুটির বয়স ছিলো নয় বছর।
বর্তমান জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ দেয়া হয় শিশুর নয় মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। ফলে এর আগ পর্যন্ত অনেক শিশু কার্যত সুরক্ষাহীন অবস্থায় থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশই নয় মাসের নিচে হওয়ায় গত মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ হামের টিকার বয়স ছয় মাসে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছিলো। বর্তমানে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেয়া হচ্ছে। তবে নিয়মিত টিকাদানের সময়সূচি এখনও পরিবর্তন হয়নি।
ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, সাধারণভাবে ধারণা করা হয় মায়ের দুধ পান করা শিশুরা মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে অন্তত নয় মাস পর্যন্ত কিছুটা সুরক্ষা পায়। এ কারণেই প্রচলিতভাবে নয় মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেয়া হয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সব শিশুর ক্ষেত্রে এ সুরক্ষা সমানভাবে কার্যকর থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়স থেকেই অ্যান্টিবডির মাত্রা কমতে শুরু করে। এক গবেষণায় প্রায় ২৬ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে এ সুরক্ষা দুর্বল হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
তার মতে, অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কিংবা মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না থাকাও শিশুদের ঝুঁকির অন্যতম কারণ হতে পারে। যেসব মা আগে কখনও হামে আক্রান্ত হননি বা টিকা নেননি, তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে শিশুরাও সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি কম পায়।
আরিফুল বাশার বলেন, বর্তমানে অনেক মায়ের শরীরে প্রাকৃতিক সংক্রমণের পরিবর্তে টিকার মাধ্যমে তৈরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সে সুরক্ষা সবসময় শিশুদের নয় মাস বয়স পর্যন্ত কার্যকর নাও থাকতে পারে। এ কারণেও কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের জটিলতা অত্যন্ত দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মেনিনজাইটিস, চোখের সংক্রমণ ও এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা না পেলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া প্রায় সব শিশুরই জ্বর ও শ্বাসকষ্ট ছিলো। অন্তত ১১ শিশুর নিউমোনিয়া হয়েছিলো। অন্যদের মধ্যে ডায়রিয়া, মেনিনজাইটিসসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা গেছে।
এদিকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৫ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, এর মধ্যে ৬৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হয়েছে এবং ৩৫০ জন মারা গেছে হাম-সদৃশ উপসর্গে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এটিকেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বলা হয়। এ সুরক্ষা অর্জিত হলে ভাইরাস সহজে ছড়াতে পারে না এবং টিকা নেয়া ও না নেয়া— উভয় শ্রেণির মানুষই পরোক্ষভাবে সুরক্ষিত থাকে।
সবার দেশ/কেএম




























