Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০১:০৬, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ০১:২৭, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বিএনপি কি আবারও এক-এগারোর পথে? তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে ষড়যন্ত্রের শঙ্কা!

বিএনপি কি আবারও এক-এগারোর পথে? তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে ষড়যন্ত্রের শঙ্কা!
ছবি: সবার দেশ

২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছিলো। রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন অভিযোগ উঠেছিলো, বিএনপি সরকার নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার পথ তৈরি করছে। দুই দশকের বেশি সময় পর আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কাঠামো নিয়ে আলোচনায় এসেছে নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব। এবার আলোচনায় ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কি ঘটতে যাচ্ছে? নাকি এটি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ? প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। এ পরিবর্তন নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন বিচারপতি কে এম হাসান। বিরোধীদের অভিযোগ ছিলো, তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার সম্ভাবনা তৈরি করতেই অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছিলো। তৎকালীন বিএনপি সরকারের এ পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। 

এর পরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। ২০০৬ সালের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটনাটি এক-এগারো নামে পরিচিত।

তবে এক-এগারোর জন্য একটি সিদ্ধান্ত বা একটি রাজনৈতিক দলের পদক্ষেপকেই একমাত্র দায়ী করা যায় না। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার সংকট, রাজপথের সংঘাত এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যর্থতা—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়েছিলো। অতীতের এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন আছে, বিশেষ করে যখন নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে সাংবিধানিক পরিবর্তনের আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় কেউ কেউ ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেখানে এ পদ রাখা এবং ভাইস প্রেসিডেন্টকে উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচন করে তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন, এসব মতামত এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কমিটি প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে; এরপর প্রতিবেদন ও সম্ভাব্য আইন প্রণয়নের বিষয়ে অগ্রসর হবে। অর্থাৎ, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি বা স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিষয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নতুন পদ সৃষ্টি করার প্রয়োজন কেনো? এ পদে কে দায়িত্ব পালন করবেন, তাকে কীভাবে নির্বাচন করা হবে, তার নিরপেক্ষতা কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সমাধানের পথ কী হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা জরুরি।

শুধু পদ সৃষ্টি করলেই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয় না। কোনও পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক সমঝোতা ও জনআস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে নতুন কাঠামোও পুরোনো বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বরং পদটির নাম বা সাংবিধানিক অবস্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়োগের নিয়ম, ক্ষমতার সীমা, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা।

বিএনপির সামনে এ ক্ষেত্রে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা রয়েছে। দলটি দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলে এসেছে। এখন সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থেকে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার সময় তাদের প্রমাণ করতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের নিয়ম কোনও ব্যক্তি বা দলের সুবিধা বিবেচনায় তৈরি হচ্ছে না। নিয়মটি এমন হতে হবে, যাতে ক্ষমতাসীন দল যেমন আস্থা রাখতে পারে, তেমনি বিরোধী দলও ফলাফল মেনে নেয়ার মতো নিশ্চয়তা পায়।

২০০৪ সালের অভিজ্ঞতা বিএনপির জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তখন বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো কি না, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিলো। আজও যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় এমন কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়, যা ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সুযোগ তৈরি করে, তাহলে একই ধরনের সন্দেহ ফিরে আসবে। আর রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি হলে সাংবিধানিক উদ্যোগের উদ্দেশ্য যত ভালোই হোক, তা গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে।

তবে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার: কোনও প্রস্তাব আলোচনায় আসা মানেই তা ষড়যন্ত্রের অংশ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব আসতেই পারে। সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে হবে যুক্তি, স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক সামঞ্জস্য এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে। প্রস্তাবটি কে দিয়েছেন, কেনো দিয়েছেন, এর ফলে কার কী সুবিধা বা অসুবিধা হবে এবং বাস্তবে এটি কতটা নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই আসল।

এখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান সংশোধন যদি কেবল সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে এগোয়, তাহলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ঘাটতি থেকেই যেতে পারে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমন একটি বিষয়, যার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সব বড় রাজনৈতিক শক্তির আস্থার ওপর। বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে কাঠামো তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে নির্বাচন ঘিরে নতুন বিরোধের আশঙ্কা থেকেই যাবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব কমানো এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে জনমনে আস্থা তৈরি করা। সে ব্যবস্থার নেতৃত্বে কে থাকবেন, তা নির্ধারণের নিয়মও হতে হবে এমন, যাতে কোনও পক্ষ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। স্পিকার, ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা অন্য কোনও সাংবিধানিক পদ—কোনোটিই নিজে থেকে নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা দেয় না। নিশ্চয়তা দিতে পারে কেবল গ্রহণযোগ্য নিয়োগপ্রক্রিয়া, স্পষ্ট সাংবিধানিক বিধান এবং রাজনৈতিক সমঝোতা।

বিএনপি যদি সত্যিই অতীতের বিতর্ক এড়াতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে প্রস্তাবিত কাঠামোর প্রতিটি ধাপ জনসমক্ষে পরিষ্কার করা। কে প্রস্তাব দেবেন, কারা নির্বাচন করবেন, কোনও পক্ষ সম্মত না হলে কী হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আইনে নির্দিষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এক-এগারোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক আস্থার সংকট দীর্ঘায়িত হলে তার পরিণতি শুধু একটি নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর দায়িত্ব শুধু বিরোধী দলের নয়, ক্ষমতাসীন দলেরও।

ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রস্তাব নিয়ে এখনই বিএনপিকে ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত করা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি অতীতের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে প্রস্তাবটিকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করাও সমীচীন হবে না। আসল পরীক্ষা হবে—প্রস্তাবটি কি সবার জন্য সমান নিয়ম তৈরি করছে, নাকি কোনও পক্ষের সুবিধা নিশ্চিত করার সুযোগ রাখছে?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নতুন আলোচনা তাই কেবল সাংবিধানিক পদ সৃষ্টির বিতর্ক নয়; এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণতান্ত্রিক আস্থা ও ক্ষমতার ব্যবহারেরও পরীক্ষা। বিএনপি পুরোনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট: নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা, সমঝোতা এবং জনগণের আস্থা।

লেখক ও সংবাদকর্মী

শীর্ষ সংবাদ:

এইচএসসির ফল ২৯ অক্টোবর
বিএনপি কি আবারও এক-এগারোর পথে? তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে ষড়যন্ত্রের শঙ্কা!
এনসিপিতে ফিরবেন না জাবীন, অনিশ্চয়তায় জারা-খালেদ
সৌদির বিমান হামলায় নারী-শিশুসহ নিহত ৯ ইয়েমেনি
গণঅভ্যুত্থান বেহাত করেছেন তারেক রহমান: নাহিদ ইসলাম
গ্রামবাসীর ধাওয়া খেয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পালালো বিএসএফ
হাসপাতালে মঈন খানকে দেখতে গেলেন মির্জা আব্বাস
সচিবালয় স্থানান্তরে ৩৫০০ কোটি টাকা ব্যয়, প্রশ্ন যৌক্তিকতা নিয়ে
নোট অব ডিসেন্ট বদলাতে বৈঠকে আসতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
হাসিনা আমলের বিতর্কিত আমলার চুক্তি বাড়ানোর তোড়জোড়
মেঘনায় ভাসমান রেস্টুরেন্টে এসএসসি ’৯৭ ব্যাচের স্মৃতির মেলা
ভালোবাসার আলিঙ্গনেই ভাঙলো স্ত্রীর ৫ পাঁজর!
আসিফের গাড়িতে গুলি, সিজেএফডির নিন্দা
কানাডায় ভিসা জালিয়াতি, অভিযুক্ত ৫ বাংলাদেশি
আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি
কক্সবাজারে হোটেলের আগুন নিয়ন্ত্রণে, রক্ষা পেলেন ৩০০ পর্যটক