খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারিক অবিচারের দীর্ঘ অধ্যায়
হাসিনার রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার হয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে বিচারিক অবিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে—এমন অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। দলটির দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে শেখ হাসিনা সরকার বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে একের পর এক মামলা দিয়েছে, কারাদণ্ড দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেত্রীকে দীর্ঘদিন কারাবন্দী করে রেখেছে।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আলোচিত মামলাগুলোর পরিণতিও এখন সে বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। যে মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিলো, পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের রায়ে সেসব মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলার অভিযোগ, প্রমাণ, আইনের প্রয়োগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন অসঙ্গতিও উঠে এসেছে।
ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ
খালেদা জিয়ার ওপর রাজনৈতিক ও বিচারিক চাপের অধ্যায়ের শুরু আরও আগে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাড়িটি ছিলো তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত। বিএনপির অভিযোগ, শেখ হাসিনা সরকারের সময় পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া শেষ না করেই তাকে ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
এর আগে ওয়ান-ইলেভেনের সময় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি ভবনে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে তাকে বন্দী রাখা হয়।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিএনপির অভিযোগ, শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছেন। দলটির ভাষ্য, সরকারের অনুগত বিচারক ও বিচারপতিদের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে একের পর এক মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর একটি ছিলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা। মামলায় প্রায় ২ কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের পরই খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। এটিই ছিলো তার বিরুদ্ধে প্রথম দণ্ডাদেশ।
পরবর্তীতে হাইকোর্ট ওই সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে। বিএনপি শুরু থেকেই মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র হিসেবে দাবি করে আসছিলো।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মামলাটির আইনি পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। আপিল বিভাগ খালেদা জিয়াসহ মামলার আসামিদের খালাস দেন। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন সর্বোচ্চ আদালত।
প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, খালেদা জিয়া কোনও চেকে স্বাক্ষর করেছেন কিংবা সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন—এমন কোনও দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি।
মামলার মূল অভিযোগ ছিলো অর্থ আত্মসাৎ। কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট অর্থ ব্যাংকে জমা ছিলো এবং তা আত্মসাৎ করা হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণ বেড়েছিলো।
অর্থাৎ যে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া হয়েছিলো, সে অর্থের ব্যক্তিগত আত্মসাৎ বা তছরুপের সরাসরি প্রমাণ মামলায় পাওয়া যায়নি—এমন বিষয়ই আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব পায়।
দুদকের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন
মামলাটি দায়েরের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলে আপিল বিভাগ। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, একটি বেসরকারি ট্রাস্টের বিষয়ে যথাযথ অভিযোগ ও আইনগত ভিত্তি ছাড়া দুদকের মামলা করা এখতিয়ারসংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি করে।
এ কারণে মামলার ভিত্তি নিয়েই আইনি প্রশ্ন দেখা দেয়।
হাইকোর্টের সাজা বৃদ্ধি নিয়েও আপত্তি
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো। পরে হাইকোর্ট সে সাজা দ্বিগুণ করে ১০ বছর করে; যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করে। সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ত্রুটিপূর্ণ যুক্তির ওপর ভিত্তি করে সাজা বাড়ানো হয়েছিলো। হাইকোর্টের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তোলা হয়।
শেষ পর্যন্ত এসব অসঙ্গতি বিবেচনায় নিয়ে আপিল বিভাগ আগের সব সাজা বাতিল করে খালেদা জিয়াসহ মামলার আসামিদের খালাস দেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও একই চিত্র
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরেকটি বহুল আলোচিত মামলা ছিলো জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা। এ মামলায়ও তার বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয় এবং বিচারিক আদালত তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন।
তবে পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর উচ্চ আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া খালাস পান।
আরও পড়ুন <<>> চেতনার কত রঙ!
এই মামলার রায়েও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। মামলার নথিতে যেসব ব্যাংকিং লেনদেন ও ট্রাস্টের অর্থের কথা বলা হয়েছিলো, সেগুলোর সঙ্গে খালেদা জিয়ার সরাসরি স্বাক্ষর বা নির্দেশনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
আইনের ভুল প্রয়োগ
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই ধারাটি মূলত সরকারি কর্মচারীর মাধ্যমে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এ ধারা প্রয়োগ করার মতো প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি ছিলো না। ট্রাস্টের অর্থের ওপর তার ব্যক্তিগত মালিকানা বা আধিপত্য কিংবা সে অর্থ থেকে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ফলে অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের সঙ্গে তাকে যুক্ত করার আইনগত ভিত্তি দুর্বল ছিলো বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
মামলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও পর্যবেক্ষণ
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার চূড়ান্ত রায়ে আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিদ্বেষমূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়াকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তথ্য গোপন ও আইনের অপব্যবহার করা হয়েছিলো কি না, সে বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব পায়।
মামলার অভিযোগে ট্রাস্টের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও পরবর্তী তদন্ত ও নথিপত্রে সে অর্থ ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাবেই থাকার বিষয়টি সামনে আসে। কোনও ব্যক্তি ওই অর্থ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন
শুধু মামলার অভিযোগ ও প্রমাণ নয়, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিলো, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া হয়নি এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে বিচারিক প্রক্রিয়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও তার বিচার ও কারাবাস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলো বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
২০১৮ থেকে কারাবাস
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাজা পাওয়ার পর খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাজীবন শুরু হয়। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ আসে।
দীর্ঘ কারাবাসের সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর দাবিতে বিএনপি দীর্ঘদিন আন্দোলন করে। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইনি সীমাবদ্ধতার কথা বলে সে অনুমতি দেয়নি।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মহামারির সময় পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর কয়েক দফায় তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু মুক্ত থাকলেও তিনি কার্যত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে ছিলেন এবং গুরুতর অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
৫ আগস্টের পর মুক্তি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার মুক্তির পথও খুলে যায়। পরদিন রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি মুক্তি পান।
এরপর তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারিক পরিণতিও বদলে যেতে শুরু করে। একে একে উচ্চ আদালতে তিনি খালাস পেতে থাকেন। ফলে বিএনপির দীর্ঘদিনের অভিযোগ—খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে দমন করতেই এসব মামলা ব্যবহার করা হয়েছিলো—তা নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের বিচারিক অধ্যায়
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুর্নীতির মামলাগুলো শেষ পর্যন্ত শুধু আইনি লড়াইয়ের বিষয় হয়ে থাকেনি; বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা হয়ে উঠেছিলো ক্ষমতা, বিরোধী রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
যে মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিলো, পরবর্তীতে সে মামলাতেই উচ্চ আদালতের রায়ে তিনি খালাস পেয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে প্রমাণের ঘাটতি, আইনের ভুল প্রয়োগ, বিচারিক যুক্তির ত্রুটি এবং মামলার উদ্দেশ্য নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন।
বিএনপির দৃষ্টিতে, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জিঘাংসার পাশাপাশি বিচারিক অবিচারেরও শিকার হয়েছিলেন। আর তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিচারব্যবহারের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























