সুনামগঞ্জে উদ্বেগ আর হতাশার চিত্র
অবিরাম বৃষ্টি আর পানিতে ডুবছে হাওড়, দিশেহারা কৃষক
সুনামগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে এখন শুধু উৎকণ্ঠা আর হতাশার চিত্র। একদিকে অস্থির আবহাওয়া, অন্যদিকে হাওড়ে বাড়তে থাকা পানি—সব মিলিয়ে বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকরা।
দুই দিনের রোদের পর শনিবার ফের বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান কাটা ও শুকানো নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়। তবে রোববার সারাদিন বৃষ্টি না হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান কৃষকরা। রোদের সুযোগে দিনভর ধান কাটা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন তারা।
তবুও স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিন আরও বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে জেলার ১২ উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওড়জুড়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কৃষকদের চোখেমুখে এখন আতঙ্ক—কতটুকু ফসল শেষ পর্যন্ত ঘরে তুলতে পারবেন, তা নিয়েই অনিশ্চয়তা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। শনিবার (২ মে) পর্যন্ত প্রায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে দাবি করছে কৃষি বিভাগ। তাদের হিসাবে, অন্তত ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে কৃষকদের সংগঠন ‘হাওড় বাঁচাও আন্দোলন’ এ হিসাবকে বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গত বলে দাবি করেছে। সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক কুদরত পাশা বলেন, কৃষি বিভাগ এবার কলম দিয়ে ধান কাটছে। ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে—এ তথ্য বাস্তব নয়। কিছু ধান কাটা হয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টির কারণে কৃষকরা সেগুলো ঘরে তুলতে পারেননি। খলায় পড়ে থাকা অনেক ধানে ইতোমধ্যে চারা গজিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হাওড়ে এখন গলা সমান পানি। পানির নিচে থাকা ধান কাটতে শ্রমিকরা আগ্রহী নয়। বাস্তবতা হলো, সুনামগঞ্জের কৃষকরা এবার ৩০ শতাংশ ধানও ঘরে তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
দেখার হাওড়ের কৃষক সামসুউদ্দিন বলেন, হাওড়ে এখন শ্রমিক পাওয়া যায় না। পানি এতো বেশি যে কেউ ধান কাটতে নামতে চায় না। আমরা চলে গেলে অনেকে নিজের মতো করে পানির নিচ থেকে ধান তুলে নেয়। সে ধানে আমাদের কোনও অংশ থাকে না। ধান ফলাতে ঋণ করতে হয়েছে, এখন সে দেনা কীভাবে শোধ করবো—এ চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওড়পাড়ের কৃষক দিলদার হোসেনও একই হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কিছুটা রোদ ছিলো, তখন ডুবে যাওয়া ধান কেটে শুকাতে পেরেছিলাম। কিন্তু শনিবারের বৃষ্টি আবার সবকিছু অনিশ্চিত করে দেয়। আজ রোদ থাকায় কিছুটা কাজ হয়েছে, কিন্তু আগামীকাল কী হবে কেউ জানি না। যদি টানা এক সপ্তাহ বৃষ্টি না হতো, তাহলে অন্তত কিছু ধান ঘরে তুলতে পারতাম।
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক জমির ধান পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার যেসব ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও ঠিকমতো শুকাতে না পারায় পচে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দিনরাত পরিশ্রম করে উৎপাদিত ফসল হারানোর শঙ্কায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তারা।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানির স্তর ছিল ৪ দশমিক ৭৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ৩০ মিটার নিচে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি ২৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে জেলায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী এক সপ্তাহের আবহাওয়ার পূর্বাভাস ভালো নয়। আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, এখন পর্যন্ত জরিপে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আমরা নিয়মিত মাঠে কাজ করছি। আগামী কয়েক দিনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























