হামলা স্থগিতের পর ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ব্যাপক আঘাত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা শুরু করেছে, যার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, সোমবার (২৩ মার্চ) ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘বিস্তৃত হামলা’ শুরু করেছে। যদিও হামলার বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে একাধিক স্থানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা United States Central Command-এর প্রধান ব্র্যাড কুপার অভিযোগ করেছেন, ইরান জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইরানের কুম প্রদেশে একটি টারবাইন ইঞ্জিন কারখানায় হামলা চালিয়েছে, যা Islamic Revolutionary Guard Corps-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে তেহরানে বিস্ফোরণের মাত্রা ছিলো ‘অভূতপূর্ব’—বিশেষ করে শহরের পূর্বাঞ্চলে। সেখানে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। দেশটির আধা-সরকারি Fars News Agency জানিয়েছে, খোররামাবাদে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় এক শিশু নিহত হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
তাবরিজে পৃথক হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়া বান্দার আব্বাস, ইসফাহান, কারাজ ও আহভাজসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। আহভাজে একটি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের Iranian Red Crescent Society জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৮০ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সংঘাতের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের ভেতরেও রাতভর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত ছিলো। দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এবং উত্তরাঞ্চলে একযোগে হামলার আশঙ্কায় সাইরেন বেজে ওঠে। সেখানে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেও ইরান তা কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখছে। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে আইআরজিসি জানিয়েছে, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও শিল্প স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানের প্রতিরক্ষা পরিষদ আরও সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ উপকূল বা দ্বীপে হামলা হলে সমুদ্রপথে মাইন পেতে উপসাগরীয় রুট কার্যত বন্ধ করে দেয়া হবে—যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
চলমান এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলে ইরানি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন।
সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান Fatih Birol সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের চেয়েও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও। আবুধাবির আল-ধাফরা ঘাঁটির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের সময় ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষে এক ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে বাহরাইন ও কুয়েতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা রিয়াদগামী একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং পূর্বাঞ্চলে ড্রোন ধ্বংস করেছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বিরতি’ বাস্তবে কোনও স্বস্তি আনতে পারেনি; বরং মধ্যপ্রাচ্য এখন পূর্ণমাত্রার সংঘাতের দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























