গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন
মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মসনদে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং
রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পর অবশেষে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের আসনে বসতে যাচ্ছেন সে অভ্যুত্থানের নায়ক, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন নয়, বরং সামরিক শাসনকে নতুন রূপে প্রতিষ্ঠার কৌশল।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সরকার প্রধান অং সান সু চি-কে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন হ্লাইং। সে সময় তিনি এক বছরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময়সীমা পেরিয়ে যায় দীর্ঘ পাঁচ বছর।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পদে তার অভিষেক কার্যত নিশ্চিত হয়েছে। তবে এ নির্বাচনকে ‘নিয়ন্ত্রিত’ এবং ‘একতরফা’ বলে অভিহিত করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, দেশটির পার্লামেন্ট এখন পুরোপুরি সামরিক বাহিনীর প্রভাবাধীন।
মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের ২৫ শতাংশ আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। বাকি আসনের বড় অংশই পেয়েছে সামরিক সমর্থিত দল ইউএসডিপি। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে হ্লাইংয়ের নির্বাচিত হওয়া ছিলো অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত।
ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক রদবদল হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখছেন হ্লাইং। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সেনাপ্রধান হয়েছেন ইয়ে উইনও, যিনি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি একটি ‘পরামর্শক পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বেসামরিক ও সামরিক উভয় খাতেই হ্লাইংয়ের প্রভাব বজায় থাকবে।
গত পাঁচ বছরে মিয়ানমার কার্যত এক গভীর মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে সামরিক জান্তা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
নির্যাতনের ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের বর্ণনায়। আন্দোলনকারী এক ব্যক্তি জানান, তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর, সিগারেটের ছ্যাঁকা এবং যৌন নির্যাতনের মতো অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশটি চরম সংকটে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘ-এর হিসেবে, বর্তমানে দেশটির ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে কিছু রাজনৈতিক মহল সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছে। প্রবীণ রাজনীতিবিদ মিয়া আয়ে মনে করছেন, সংকটের একমাত্র সমাধান আলোচনার মাধ্যমে। তিনি কারাবন্দি নেত্রী অং সান সু চির মুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন গুঞ্জনও রয়েছে— প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর হ্লাইং হয়তো সু চিকে মুক্তি দিতে পারেন।
তবে বিরোধী শক্তিগুলো এ নির্বাচনের বৈধতা মানতে নারাজ। জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) এবং বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্পষ্ট করে জানিয়েছে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরানো না হলে তাদের আন্দোলন চলবে।
সব মিলিয়ে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের অভিষেক মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফেরার পথ খুলে দিচ্ছে— এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। বরং এটি সামরিক শাসনের নতুন অধ্যায় বলেই দেখছেন তারা।
সূত্র/বিবিসি
সবার দেশ/কেএম




























