Sobar Desh | সবার দেশ আসমা সুলতানা শাপলা


প্রকাশিত: ০৯:৩৭, ৫ জুন ২০২৬

আমি এক স্বপ্নবাজ, আশা রাখি শেষ নিঃশ্বাস অবধি 

আমি এক স্বপ্নবাজ, আশা রাখি শেষ নিঃশ্বাস অবধি 
ছবি: সবার দেশ

কি লিখবো আর কেনো-ই বা লিখবো এইসব। আর লিখবো না কোনও রাজনৈতিক লেখা। ফিরে যাবো আবার আমার একার সন্ন্যাসে, সাহিত্যের  সৃজনশীল লেখার ধ্যানে - এই ভাবতে ভাবতে গত একুশটা মাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে চলা ঘটনা নিয়ে আমার যত সব ভাবনা লিখেই চলেছি। 

কোটা আন্দোলন যখন থেকে শুরু হয়েছিলো তখন থেকে ৫ অগাস্ট অবধি যতবার ভেবেছি, এইবার শান্ত হবে বাংলাদেশ, আরো বহু শান্তিকামী সাধারণ বাংলাদেশীর মতো ঠান্ডা হবে আমারও মাথা-মন-মগজ। কিন্তু হলো কই? রাজনৈতিক ভাবনা থেকে ব্যক্তি আমিও সরে থাকতে পারলাম কই? একটা সময় এসে মনে হতে লাগলো, নাহ, সরে যাবার দরকার নাই। কেনো সরে যাবো? একজন লেখক কি শুধুই ফুল-পাখি-লতা-পাতা বিরহ নিয়ে কবিতা লিখবেন আর লিখবেন কুসুম কুসুম প্রেমের গল্প? একজন লেখককে কি বুদ্ধিজীবিই হতে হবে? কেউ কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন যে কোনও লেখক মাত্রই বুদ্ধিজীবি? তিনি আড়ালে আবডালে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আবরণ আর আরভরণে ঢেকেই লিখবেন যাবতীয় জটিল রাজনীতির কথন?

আমি তা মনে করি না। যখন যা দরকার তখন তাই করবেন একজন লেখক। যখন দরকার তরবারি তখন কাকু-বক্রোক্তি কোনও কাজের কথা নয়, অন্তত আমার কাছে। যখন তীব্র পিপাসায় দরকার পানের যোগ্য পানি তখন পেপসিকোলাতে কাজ চলে না। লেখকের কলম-কীবোর্ড যদি দেশের প্রয়োজনে তরবারি হয়ে উঠতে না পারে আমার কাছে সে লেখকের কোনও মূল্য নাই। সে আমি নিজে হলেও তাই। আমার মেয়েদের কাছেই বা কি জবাব দেবো তার? আমি আর থামলাম না। পড়ে রইলাম এখানেই। 

২০২৪ এর জুন মাস, পুরাটা জুলাই এবং অগাস্টের ৫ পর্যন্ত কেবল মৃত্যু দেখেছি, মৃত্যু- ভয়ানক বীভৎস সেইসব মারনখেলা। আমাদের কাছে যে কী তীব্র জ্বালাময় শাসকের সেই উদযাপন! একদিকে মায়ের বুকের ধন রাস্তায় পড়ে পড়ে মরে অন্যদিকে বিটিভি মেট্রোরেলের জন্য কেঁদে মরে খুনি আর তার চাটুকার-গণহত্যার দোসরের দল। একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞকেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে হার মানায় এই দেশের নিরপরাধ সন্তান নিধনের আয়োজন। ল্যাথাল উইপেন দিয়ে ১২ বছরের শিশু খুন! ঘরের ভেতরে বাচ্চা নিহত হয় হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে। শুকাতে দেয়া বাচ্চার কাপড় আনাতে গিয়ে ছাদে গুলি খেয়ে মরে যান দুইমাস বয়সের শিশুর মা! নাতির জন্য আইসক্রিম আনতে গিয়ে বাড়ির গেটে গুলি খয়ে মরেন নানু। ছাত্র শিশু কিশোর যুবা বৃদ্ধ নিধনের কি ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ চলেছে পুরাটা জুলাই জুড়ে আর কি নারকীয় তার তান্ডব! নিজের দেশের শাসক দ্বারা নিজ দেশে এমন ভয়ানক হত্যাযজ্ঞ দেখতে দেখতে নির্বাক বাংলাদেশ। হতবাক সারা বিশ্ব।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্মগ্রহণ করেছি তারা পয়লাবারের মতো সরাসারি প্রত্যক্ষ করলাম অমানবিকতার এই ভয়ঙ্কর-অন্ধকার-কালো রূপ। 

জন্মেই শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। বাবা সিলেট পলিকেটেকিন কলেজে সরকারি কাজে নিয়োজিত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিরান কলোনীতে  শিশু তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আব্বার গোয়ার্তুমীর কারণে আম্মার অতিষ্ঠ জীবনের কাহিনী শুনতে শুনতে গর্বে বুক ভরে উঠতো। আব্বা মুক্তিবাহিনীর সাহারা হয়েছেন-শুনতে যে কী অসাধারণ লাগে সেই দূরন্ত ছোটবেলায়! পাক হানাদারের হাতে সুরমা নদীর পাড়ে তরুণ যুবকের সারা গায়ের চামড়া ছিলে নেবার ইতিহাস শুনতে শুনতে আম্মাকে কাঁদতে দেখে দেখে বড় হয়েছি আর সেই ইতিহাস গল্পে লিপিবদ্ধ করতে করতে কেঁদেছি আমিও। ঘৃণা করতে শিখেছি, পরম ঘৃণা করেছি পাক হানাদার বাহিনীকে। ঘৃণা করেছি রাজাকার আলবদরসহ শান্তিবাহিনীকে। কিন্তু তার কোনোটাই নিজের চোখে দেখা না। যখন ঘরে শোনা-গল্প-ইতিহাস পড়তে পড়তে জানা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়ঙ্কর গণহত্যাকে ঘৃণা করতে করতে বড় হয়ে চোখে দেখতে থাকি ২৪ এর জল্লাদভূমি এই বাংলাদেশ, তখন আমার এই দেশে এই ২০২৪ এর জুন-জুলাইতে নেমে আসে ১৯৭১ সাল, ২৫ মার্চের মতো ভয়াল কালো রাত নেমে আসে এই দেশে এই আমারই চোখের সামনে। আমার দেশের শাসকের চেহারায় নেমে আসে ১৯৭১ এর পাক হানাদারের চেহারা। যারা ছিলে নিচ্ছে আমাদের বাচ্চাদের চামড়া, ভ্যানে তুলে একসাথে বেধে পুড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের ছাত্রদের জীবন্ত দেহ। সাড়ে পাঁচ ফুট ছেলের দেহ পুড়ে খাক হবার পর মা ফিরে পান ছেলের চারফুট পোড়াদেহ। হায়, কী নির্মম এই পাশাখেলা! 

একাত্তর তখন আমার কাছে যুক্তিগ্রাহ্য চেতনায় ধরা দেয় নতুন করে। তারা তো ছিলো ভিন দেশের ভিন চেহারার ভিন ভাষা ও  সংস্কৃতির লোকজন। স্কচড্ আর্থ চালিয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে কিছু ভিনদেশী মিলিটারী। কিন্তু এ কেমন হায়েনা যার রক্ত মাংস মজ্জা ঘিলু সব আবহমান বাংলার সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ। দেখতে বাংলাদেশী। কথায় খাবারে স্বপ্ন দেখাতে কথা বলাতে নাচে গানে ভালোবাসায় তো এরা আমারই স্বজাত। এতদিন কোথায় লুকিয়েছিলো এই দেশপোড়ানো হায়নার মুখ! কোথায় ছিলো এই রাক্ষসের আঁচলতলে লুকানো রাজনীতিক সচিব আমলা কবি লেখক সম্পাদক শিল্পী কবি ও কেরানী!  

কী ভয়ঙ্কর এই দৃশ্যের সাক্ষী হওয়া! নাফিসের গুলিবিদ্ধ আধা-মৃত দেহ নিয়ে এখান থেকে সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছেন শ্রমজীবি একজন রিক্সাওয়ালা। ফ্যাসিস্টকে চ্যালেঞ্জ করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আবু সাঈদ। আহ, গুলি করে দিলো। কারণ ছাড়াই ছেলেটার তাজা বুকে তিন চারটা গুলি করে দিলো খুনি হাসিনার পালিত পুলিশ। অন্যদিকে ডিবি অফিসে নজরদারিতে নাহিদ সারজিস আসিফ হাসনাত নুসরাত। সারা বাংলাদেশে ভয়ে কাঁপছে, কখন জানি ওদের গুলি করে নাই করে দেয়া হয়। এও সম্ভব তবে জাতির পিতার সন্তান ‘মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ’ করে চিল্লাতে চিল্লাতে মুখের ছাল চামড়া তুলে নেয়া শেখ হাসিনার দ্বারা! আমার তখন শোধ-বোধ নাই। কে মারবে কাকে মারবে কিভাবে মারবে কাকে ধরবে এসব বোধজ্ঞানহীন তখন আমি, একা আমি নই, আমার ধারণা তখন সারা বাংলাদেশের নীতি নৈতিকতার ধার ঘেষে জীবন যাপন করা প্রতিটা দেশপ্রেমিক মানুষই এমন বিধ্বংসী এক মানসিক অবস্থায় দিনযাপন করছেন। আমাদের তখন কাজ নাই। খাওয়া পড়া বলতে কোনওমতে মুখে কিছু একটা তুলে দিয়ে আত্মাটাকে বাঁচিয়ে রাখা। খাবার তো মুখে ওঠে না। জীবন্ত বাচ্চাদের পোড়া দেহের গন্ধে ভার তখন বাতাস। সাঈদ-মুগ্ধ-নাফিস-ইয়ামীন-ওয়াসীমের তাজা লাল রক্তে তখন পিছলা আমার স্বদেশের সব রাস্তা পথ ঘাট। ইন্টারনেট বন্ধ করে খবরাখবর সরবরাহ বন্ধ করে দিলো সরকার। আর ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিল আমাদের ছাত্র-সন্তানদের পেছনে। 

আহা, সেই ওবায়দুল কাদের! বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমি বা আমরা তখন তার বা তাদের বেশ কাছাকাছি। টিএসসিতে তখন আমাদের স্রোত আবৃত্তি সংসদের কাজ চলে। দলীয় কাজ শেষে সালাম মামার দোকানের ধারে দেয়াল ঘেঁষে আড্ডায় কখনও ওবায়দুল কাদের এলে আমার ছাত্রলীগ করা বন্ধুরা ছুটে যেতো। আমিও যেতাম তাদের সাথে সাথে, ‘ওকাদা চা খাবো’। চায়ের সাথে মুড়ি ছোলা আর পিঁয়ার্জু  দুই পয়সা ছিটিয়ে ওকাদা তখন আমাদের কাছে খুব জনপ্রিয়, বয়ষ্ক ছাত্রনেতা বলে কথা! তখন তো আর রাজনীতি অত বুঝি না। বয়স কতই বা তখন ২২/২৩ বড়জোর। আজ ভাবি, তখনই, তখন থেকেই কি বয়স্ক ছাত্র নেতা আমাদের সেই প্রিয় ওকাদা ভেতরে ভেতরে বেড়ে উঠেছিলো হন্তারক হয়ে? নাকি দিনে দিনে ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার, পদলেহন আর একতরফা শাসনের দূর্বিনীত অহঙ্কারে ক্ষমতার নানা অলিগলির হেঁটে আর করায়ত্ব করে দিন দিন তিলে তিলে খুনি হাসিনার পদতলে গড়ে ও বেড়ে উঠেছে এই রাক্ষস! 

বিস্ময় লাগে! বড় বিস্ময়। সেই ওকাদা, ২০২৪ এর জুলাইতে ‘ওবায়দুল কাদের’ হয়ে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিল সাধারণ ছাত্রদের পেছনে। তারপরের সবতো জানাই। এইখানে থামি আজ। বড় ব্যথা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এইসব লিখতে বসলে। নতুন করে রক্ত ক্ষত বিক্ষত চোখ ঝলসানো পোড়া চামড়া রাবার বুলেটে ঝাঝড়া শত শত ছেলের চেহারা ভাসতে ভাসতে চিরে কুচি কুচি করতে থাকে আমাদের মন-মগজ-মাথা। হালকা হতে থাকে আমাদের মাথা থেকে একাত্তর, বিজাতীয় পাক আর্মির ভয়ানক হত্যাযজ্ঞের গল্প ঝাপসা হতে থাকে ২৪ এ স্বদেশী শাসকের দ্বারা রক্তের হোলিখেলার আড়ালে। 

আমি আসলে পলিটিক্যালি ভোকাল লোক না। রাজনীতির চর্চা ছোটবেলা থেকেই আমার বাসায় দেখেছি। তবে তা মাঠের বা রাজপথের না। জ্ঞানের আর অনুসন্ধানের। তাই আমি জানি, মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক। মাথায় সবসময় ঘোমটা টেনে থাকা আমার আম্মা দৈনিক পত্রিকা পড়তেন চিরিকেটে। আব্বার চেয়ে আম্মার রাজনৈতিক অনুসিন্ধৎসা ছিলো সীমানাবিহীন। আম্মার পাঠের আগ্রহ ছিলো প্রবল। জ্ঞানে তিনি ছিলেন ঋদ্ধ। দেশী ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়ে আম্মার অনুসন্ধিৎসু মন আর তার জ্ঞান আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে ছোটবেলাতেই।  ছোটবেলার প্রসঙ্গ আসতেই মনে পড়ে গেলো সেই ছবি। আমাদের বাসায় তখন একটা দৈনিক, দৈনিক ইত্তেফাক রাখা হয়। কিন্তু সারা সপ্তাহ জুড়ে সবগুলো সাপ্তাহিক পত্রিকাও রাখা হয়। আম্মা চিরি কেটে পড়তেন সবগুলো পত্রিকা। বেগম, সচিত্র সন্ধানী, সাপ্তাহিক বিচিত্রা এমনকি সিনেমার পত্রিকা চিত্রালি পূর্বাণী সব। আমি তখন রাজনীতির চেয়ে সিনেমার পত্রিকাই দেখি বেশি। কিন্তু এখনও সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচ্ছদের ছবিটা ভেসে আছে চোখে- ইন্দিরা গান্ধীর হাতের থাবার নিচে তালপট্টি। আম্মা বললেন, ‘আস্তে আস্তে নিবে সব। মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করছে আর নিছে কি কি?’ 

১৯৮১ সাল। আমার কতই বা বয়স, বড় জোর ১০ কি ১২। আম্মা মাটিতে বসে বটি দিয়ে তরকারি কাটছেন। মাটিতেই রাখা একটা রেডিও। তাতে সকালের খবর পড়ছেন  সরকার কবিরুদ্দিন। শেখ হাসিনার বাংলাদেশে আসবার খবর। আম্মা নিজে নিজেই বলে উঠেন, ‘আসছে, বাপ হত্যার প্রতিশোধ নিয়া ছাড়বো’। এই ২০২৪ এ এসে বিস্মিত হয়ে মনের কানে শুনতে পাই আম্মার কথা। আম্মা আজ চোখের সামনে নাই। বিদায় নিয়েছেন আমাদেরকে ছেড়ে। থাকেন সাড়ে তিনহাত মাটির ঘরে। আম্মা, আপনার কথাই সত্যি আম্মা। আপনি কি শুনতে পান প্রতিশোধের দা বটি রামদা বন্দুক আর আরো সব সরকারি অস্ত্রের নিচে কাটা পড়া বাংলাদেশের চিৎকার। 

কতটা প্রজ্ঞা ছিলো আমার আম্মার, ২০১৮ তে বিদায় নেয়া আম্মার ভবিষ্যৎ বাণীর কথা ভেবে দেখি ২০২৪ এ এসে মিলে গেলো সব । সেই রক্ত সেই মেজাজ সেই প্রজ্ঞারই খানিক হয়তো আমার নিজের ভিতর কোনও এককালে প্রবিষ্ট হয়েছিলো অজান্তে। দিলো তো মন সব ওলট পালট করে। বলতে নিলাম কি আর এসে গেল ইন্দিরা এসে গেলে তালপট্টি। সেই ইন্দিরা হাতের থাবার নিচে তালপট্টি, ২৪ বিপ্লবের পর সমগ্র বাংলাদেশ ভারতীয় রাজাকারে ছয়লাব। 

আমরা ভেবেছি ফ্যাসিস্ট পালিয়েছে। এবার হবে রাষ্ট্রসংস্কার। ডঃ ইউনুসের হাতে ক্ষমতা দিয়ে নির্ভার ছাত্রের দল। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচি। কিন্তু এ কী এত সহজে জয় করা বাংলাদেশ! ডঃ ইউনুস ভয় পেয়ে গেলেন। আমি ফেসবুকে একটা লেখায় লিখলাম, ‘ডক্টর সাহেব আপনি ভয় পাবেন না। ৮৪ বছর বয়স একটা বোনাস লাইফ। বহু লোক এই বয়সে জীবিতই থাকেন না। আপনি আছেন এবং দেশের ক্রান্তিকালে দেশের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। আপনি কথা বলেন। আপনি শক্ত হয়ে দাঁড়ান। ভারতীয় রাজাকারদের আপনি সাহারা দিয়েন না। কি করবে, আপনাকে মেরে ফেলবে? আপনি তো অনেক পেয়েছেন। দেশ বিদেশে আপনার সম্মানের কমতি নাই। দেশের জন্য যদি আজ শহীদ হয়ে যান বাংলাদেশ আপনাকে মাথায় করে রাখবে। তবুও আপনি দেশ-বিরোধীদের প্রশয় দিয়েন না।’ এই কথা কেবল আমার না। বহু বাংলাদেশী তাকে এই জায়গাটাতে চেয়েছি, ভেবেছি। বাট, তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। ক্ষমতাশীলের রং বদলে গেলো। পোশাক বদলালো। ভেতরটা একই-কালো-অন্ধকার।

অরেকটু পেছনে যাই। ১৯৭১ সালে পশ্চিম রণাঙ্গন থেকে যুদ্ধ ঠেলে দেয়া হল পূর্ব রণাঙ্গনে। মরলো-শহীদ হলো পূর্ব-পাকিস্তানের লক্ষ যুবক যুবতী মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তান হানাদারের হাতে সম্ভ্রম হারালো হাজারো নারী। দুই পাকিস্তান এক থাকলে ভারতের বড় ঝামেলা হয়ে যায়। অতএব পাকিস্তান ভাগ করো। পূর্ব-পাকিস্তানে অনুপস্থিত শেখ মুজিবের নেতৃত্বে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চেই পালালেন তাজউদ্দিন আহমেদ। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে ভারত পৌছালেন। ইন্দিরা গান্ধীর সাহায্য চাইলেন। সাথে অনুরোধ করলেন, ‘এই যুদ্ধকে আপনি বা ভারত যেনো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসাবে প্রচার না করেন। এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ।’ কিন্তু আজ অবধি ভারতের কোনো বইতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে কিছুই পাবেন না। ভারতের যাদুঘরগুলোতে বাংলাদেশের কোনও মুক্তিযোদ্ধা তো বাদ, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর একজনেরও নাম বা ছবি দেখবেন না।  এই কথাটা আমার আম্মা বলতেন। তখন ছোট তাই বুঝতাম না শাায়ত্বশাসন কী আর স্বাধীনতাই বা কী! আম্মা বলতেন, ‘পূর্ব-পাকিস্তান চেয়েছিলো শায়ত্বশাসন। অথচ নয় মাসের যুদ্ধে পূর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলো।’ 

১৬৬+১ আসন জিতে সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ-শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা আর নির্বাচিত হয়েছিলেন অখন্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কার না তখন গর্ব হবে? তারও হয়েছিলো। পূর্ব পাকিস্তানেরও হয়েছিলো। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ সমস্যা দেখি না। 

হোটেল পূর্বাণিতে ভুট্টো-মুজিবের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর অপেক্ষারত সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ইয়োর এক্সিলেন্স, পাকিস্তান কি ভাগ হতে চলেছে?’ মুজিব রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনারা অস্থির কেনো? পাকিস্তান অখন্ড রবে’। এটা নিয়ে এই ২০২৪ বিপ্লবের পর বিভক্ত বাংলাদেশী জনতার মাঝে নানা কন্ট্রোভার্সি তৈরি হয়েছে। সে যাই হোক, সেই পাকিস্তান ভাঙলো ভারত। বহু লোক ভারতে আশ্রয় নিলো। ভারত লুঠে নিলো বাংলাদেশের বহু মালামাল অস্ত্র রেলের বগি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিল। তলে তলে ভারতের সাম্রাজ্যবাদী চেহারাটা এই ২৪ এ এসে প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়লো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সামনে। 

স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশে ভারতের লুঠপাট, পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা, মেজর জলিলকে পদচ্যুত করা,  চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান গুম হওয়া এইসব ঘটনা ২০২৪ বিপ্লবের পর প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী সরকারের আমলে এইসব ট্রানজিট, বিডিআর হত্যা, তিস্তা ব্যারেজ, ফারাক্কা, সাগর-রুনী হত্যা, আবরার হত্যা, বিশ্বজিৎ হত্যা, রাতের ভোট, ক্রসফায়ার, হল দখল, বিশ্ববিদ্যালগুলার হলে হলে ছাত্রলীগের গণরূম-রেগিং চাঁদাবাজি- ইলিয়াস হত্যা, গুমঘরে রোজাদার নারী ধর্ষণ, দাঁড়ি টুপি পরা হলেই জঙ্গী বা সন্ত্রাসী হিসাবে ট্যাগ, বাক স্বাধীনতা হরণ, কালাকানুন, সরকার বিরোধী বয়ানের কারণে গুম-খুন এসবে বাংলাদেশের জনগণ ফুসে ফুসে উঠছিলো ভেতরে ভেতরে। অন্যদিকে বাঙালি সংস্কৃতির নামে বাংলাদেশের শিল্পী সাহিত্যিক সুশীল লোকজন দিয়ে কোলকাতা কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আবহে গড়ে তোলা বাংলাদেশ হয়ে উঠলো ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের এক অকাট্য দলিল। ৯০% মুসলমানের দেশে মুসলিমরা দাঁড়ি টুপি রোজা নামাজের কথা বলতে ভয় পায়। ফুল-বেলোতা-চন্দন আর মঙ্গল ঘটে জ্বালানো প্রদীপে শুরু হয় আবাহন। 

সংস্কৃতির আগে ভাষার আগ্রাসনটা (ভাষার কলোনিয়ালিজম) শুরুটা হয়েছিলো আরো বহু আগে। আজ থেকে ২০০ বছরেরও বেশি আগে। যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ছত্রছায়ায় বাংলাকে সংস্কৃত নামের এক মৃত ভাষা দিয়ে দখল করার চেষ্টায় সফল হয়েছিলেন বঙ্কিম-ইশ্বরচন্দ্র-মৃত্যঞ্জয় তর্কালঙ্কার গং, যদিও সবুজপত্রের দ্বারা প্রমথ চৌধুরীরা সংস্কৃত শব্দ কমিয়ে এনে বাংলাভাষাকে একটা মানে উন্নিত করেছিলেন ‘মানভাষা’ নামে,  যাকে আমরা প্রমিত বলে ডাকি। সেটা ছিলো নদীয়া সূতানুটি ভাগীরথীর তীরবর্তি অঞ্চলের বাংলা। কিন্তু আজো আমরা সেই প্রমিত ভাষায় বই লিখি। সভা সমিতি মিটিংয়ে প্রমিত না বললে আমাদের জাত খোয়া যায়। 

জাত তো খুইয়েছি আমরা বহু আগেই। জানেন তো, যে কোনও দেশকে কলোনি বানাতে হলে পয়লা দরকার তার ভাষাকে করায়ত্ব করা। যা বহু আগেই করা হয়েছে প্রমিত দ্বারা। তারপর করায়ত্ব করতে হয় তার সংস্কৃতিকে। এই যে দেখেন বৈশাখে সাদালাল শাড়ি। কপালে লাল টিপ। ফুল বেলপাতা প্রদীপে নৃত্য গীত বাজনায় সম্ভাষণ - দেখতে কী যে অসাধারণ লাগে! রঙিন সব। সুরে সুরে আয়োজন। আহা, অপূর্ব! কোথায় হারালো আমাদের স্কুলগুলোতে বার্ষিক মিলাদ। ঘরে ঘরে কোরআন পাঠ। মক্তবে মক্তবে শিশুদের কোলাহলে সুরা কেরাত। আর নিজের নাম মুসলিম বলতেই তো আমরা লজ্জায় কুণ্ঠিত হয়ে যাই। নামের আগে পরে বাংলা বলতে আধা সংস্কৃত এমন সব শব্দ লাগাই যা জুড়ে দেবার পর ব্যক্তির নামের অর্থ এমনই কিম্ভুত কিমাকার দাঁড়ায় যা ব্যক্তি নিজেই জানে না। এটার নাম হয়েছিলো আধুনিকতা একেই বলে প্রগতিশীলতা। তাইতো, ব্যক্তিকে সম্মোহিত না করা গেলে তাকে আয়ত্বে আনাতো সম্ভব না। তাই সম্মোহনের রূপ আলাদা-রঙিন, বিচিত্র তার প্রকাশ। 

২০২৪ চোখের সামনে আনলো সব। ভারত ভাগ করে দিলো বাংলাদেশকে আবার। যে রক্তাক্ত ছাত্র জনতা এক করেছিলো ১৭ বছর নীরবে চুপ করে থাকা সাধারণ বাংলাদেশীদেরকে, যে ২৪ একটা জনযুদ্ধ তৈরি করে সম্ভব করে তুলেছিলো বিপ্লব তার সূক্ষ্ণ ফাঁক গলে ঢুকে পড়লো আবার ভারত। বিভক্ত হয়ে পড়লো জনগণ। রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধার বিতর্কের ঘুণপোকা কেটে যায় নিরবে বাংলাদেশের মানচিত্র। সেই পুরানো ক্ষয়ে যাওয়া পোকায় কাটা ছাত্রজনতার রক্তে স্বাধীন করা ছিঁড়ে ফেলা ভারতের নীল নকশাটা জোড়া দেয়া হলো, মোসাদের মতো কাজ করলো বাংলাদেশের ভিতরে কিছু দালাল। ভারতীয়  রাজাকারে রাজাকারে ভরে গেছে এখন একাত্তরের বাংলাদেশ। গড়তে দেয়া যাবে না কোনোও নতুন। নতুন বাংলাদেশে রক্তে ভিজিয়ে এনে দেয়া নতুন পতাকার তলে সমবেত আজ সব পুরানা শকুন।  

তবু আমি ও আমার মতো বাংলাদেশপ্রেমি বহু সাধারণ মানুষ আছি রাষ্ট্রসংস্কারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। হয়তো একদিন আমরাও ভারতের কাছে বিক্রী করে দেয়া মেরুদন্ডটা ফিরত পাবো। দরকার ইরানের মতো বিপ্লবী গার্ড। মানুষ তার আশার সমান বড়ো। আমি এক স্বপ্নবাজ, আশা রাখি শেষ নিঃশ্বাস অবধি। 

লেখক:
শিক্ষক, কবি, গল্পকার ও উপন্যাসিক।

শীর্ষ সংবাদ:

বেনাপোলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, আটক-২
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাল এনআইডি-পাসপোর্ট চক্রের বিস্তার
বিশ্বকাপের আড়ালে মেক্সিকোয় মানবপাচার ও যৌন বাণিজ্যের বিস্তার
নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল, সরে গেলো পুলিশ
ভারতের নতুন ‘পুশইন’ চেষ্টা: ৪ সীমান্তে আটকা ৮৮ জন
বিশ্বকাপে ক্যানাডা কতটা শক্তিধর?
সিরাজগঞ্জের বাসচাপায় তিন ভ্যানযাত্রী নিহত
ইরান ইস্যুতে রিপাবলিকানদের বিভাজন, ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা
ভৈরবে দুই পক্ষের সংঘর্ষ; ৬ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
বন্ধ কারখানা চালু করতে ২০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা
আইভীর বাড়ির সামনে পুলিশি নজরদারি
ট্রাফিক আইন মানার হুঁশিয়ারি দিয়েই অনির্ধারিত ক্রসিং পার ডিএমপি কমিশনারের
থেমে গেলো মেঘনা গ্রুপের ৮০ মিলিয়ন ডলারের আইএফসি ঋণ
আ.লীগকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করুন: নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে শোকজ
বিশ্ববাজারে তেলের দামে ফের পতন
এক দিনে সীমান্তে ১২৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ করেছে বিজিবি
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যে মমতার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা
পদ ছাড়ছেন না পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নজির টানলেন হুমায়ুন রশীদের
সাংবাদিক নার্গিস জুঁইয়ের ওপর হামলায় সিজেএফডি’র নিন্দা
যশোর-বেনাপোল -শার্শায় চাহিদা বাড়ছে তালশাঁসের
ইউনিয়ন পরিষদের জমি দখলের অভিযোগে ধর্মপাশায় মানববন্ধন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে তিন নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বিশ্বজুড়ে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা
হাদি হত্যায় মমতার বিস্ফোরক মন্তব্য, নীরব দিল্লি-বিজেপি
ইসলামী ব্যাংকে হস্তক্ষেপ হলে রাজপথে নামবে জামায়াত: ডা. শফিকুর রহমান