নিম্নস্তরেই ৮টি ভিন্ন দাম, একক মূল্যস্তরের সুপারিশ
প্রজ্ঞার জরিপ: চার স্তরে ১২ দামে সিগারেট, ব্র্যান্ড বদলের সুযোগ
সরকার নির্ধারিত চারটি মূল্যস্তরের আড়ালে ১২টি পৃথক দামে ৫৩টি সিগারেট ব্র্যান্ড বাজারজাত হচ্ছে বাংলাদেশে। এতে ভোক্তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এক ব্র্যান্ড ছেড়ে অন্য ব্র্যান্ড বেছে নেয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে সিগারেটের দাম ও কর বাড়িয়েও প্রত্যাশিত মাত্রায় ধূমপান নিরুৎসাহিত করা কঠিন হচ্ছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের ৮০ জন খুচরা বিক্রেতার ওপর পরিচালিত র্যাপিড সার্ভের ভিত্তিতে জরিপটি তৈরি করা হয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শুধু নিম্নস্তরেই আটটি ভিন্ন দামে সিগারেট পাওয়া যাচ্ছে। এ স্তরের সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের মূল্য ৯০ টাকা, যা মধ্যমস্তরের নির্ধারিত ৯২ টাকার দামের কাছাকাছি। প্রজ্ঞার মতে, এ ধরনের মূল্যকাঠামো ভোক্তাদের তুলনামূলক কম দামি ব্র্যান্ডে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
‘তদূর্ধ্ব’ শব্দেই তৈরি হচ্ছে দামের বিস্তৃত পরিসর
প্রজ্ঞার জরিপে বলা হয়েছে, সিগারেটের মূল্যস্তর নির্ধারণে সরকার ‘তদূর্ধ্ব’ শব্দটি ব্যবহার করায় কোম্পানিগুলো একটি স্তরের মধ্যে বিভিন্ন দামে পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে, নিম্নস্তরের ক্ষেত্রে ৬৫ টাকা ও তদূর্ধ্ব এবং মধ্যমস্তরের ক্ষেত্রে ৯২ টাকা ও তদূর্ধ্ব মূল্য নির্ধারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে নিম্নস্তরে ৬৫ টাকা থেকে ৯১ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন মূল্যবিন্দুতে সিগারেট বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে জরিপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রজ্ঞার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এভাবে একাধিক মূল্যবিন্দুতে বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারজাত করার সুযোগ শুধু নিম্নস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; উচ্চতর মূল্যস্তরেও একই ধরনের প্রবণতা রয়েছে। এতে সিগারেটের দাম বাড়লেও ভোক্তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য ব্র্যান্ড বেছে নিতে পারেন।
কর বাড়লেও ধূমপান কমানোর লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি, সিগারেটের মূল্যস্তর পর্যায়ক্রমে চারটি থেকে কমিয়ে একটিতে নিয়ে আসা। তাদের যুক্তি, একক মূল্যস্তর চালু হলে সব ব্র্যান্ডের মধ্যে দামের ব্যবধান কমবে এবং কর ও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের ব্যবহার কমানোর নীতিগত উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
প্রজ্ঞা বলছে, একক মূল্যস্তর চালু হলে বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপান ছাড়ার প্রবণতা বাড়াতে এবং নতুন করে ধূমপান শুরু করার প্রবণতা নিরুৎসাহিত করতে সহায়তা করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমানে একাধিক মূল্যবিন্দুতে সিগারেট কেনার সুযোগ থাকায় দাম বাড়লেও ভোক্তারা তুলনামূলক সস্তা ব্র্যান্ডে চলে যেতে পারেন। ফলে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে ধূমপান কমানোর প্রত্যাশিত প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতির জন্য বিদ্যমান সিগারেট করকাঠামোর ত্রুটিকে দায়ী করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
একক মূল্যস্তর চালুর সুপারিশ
জরিপের ভিত্তিতে প্রজ্ঞা কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রতিটি মূল্যস্তরের সঙ্গে ব্যবহৃত ‘তদূর্ধ্ব’ শব্দটি বাদ দেয়া।
- প্রতিটি স্তরে একটি নির্দিষ্ট ও একক মূল্য নির্ধারণ করা।
- পর্যায়ক্রমে সিগারেটের মূল্যস্তরের সংখ্যা চারটি থেকে কমিয়ে একটিতে নিয়ে আসা।
- কর ও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকের ব্যবহার কমানোর নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কার করা।
প্রজ্ঞার মতে, মূল্যস্তরগুলোতে নির্দিষ্ট একক দাম চালু করা গেলে সিগারেট কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন মূল্যবিন্দুতে পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ সীমিত হবে। এতে কর ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তার আচরণে আরও কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
তামাক নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সংস্কারের প্রশ্ন
বাংলাদেশে সিগারেটের কর ও মূল্য নির্ধারণ তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে শুধু কর বাড়ানোই যথেষ্ট কি না, তা নির্ভর করে বাজারে পণ্যের দাম, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা এবং বিকল্প ব্র্যান্ডে যাওয়ার সুযোগের ওপরও।
প্রজ্ঞার জরিপে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, চারটি মূল্যস্তরের মধ্যে ১২টি পৃথক দামে ৫৩টি ব্র্যান্ডের উপস্থিতি সিগারেটের মূল্যকাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে জরিপটি আটটি বিভাগীয় শহরের ৮০ জন খুচরা বিক্রেতার ওপর পরিচালিত হওয়ায় এর ফলাফলকে জাতীয় বাজারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে বিবেচনার আগে বৃহত্তর বাজারতথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, সিগারেটের মূল্যস্তর পুনর্বিন্যাস, করকাঠামোর সংস্কার এবং ভোক্তার আচরণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব—এ তিনটি বিষয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রজ্ঞার সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সিগারেটের বাজারে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে; তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে নীতির বাস্তবায়ন ও বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
সবার দেশ/এমকেজে




























