ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে জিম্মি রাষ্ট্রসংস্কার: টিআইবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, রাষ্ট্রসংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গেলেও বাস্তবে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেয়া এক বিবৃতিতে টিআইবি এসব কথা জানায়। সংস্থাটি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রসংস্কারের দায়িত্ব পালনে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ও সাহসী উদ্যোগের ঘাটতি ছিলো। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপস করার কারণে সংস্কারের কাঙ্ক্ষিত ভিত্তি তৈরি হয়নি। এর ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাবে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ এবং চর্চার হাতবদল ঘটেছে। ফলে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রসংস্কারের ভবিষ্যৎ এখন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটও জনস্বার্থে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার পরিবর্তে দলীয় রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করার অবস্থান রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তার মতে, সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন এবং আইন প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া কার্যত ক্ষমতাসীন জোটের একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বর্তমান সরকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছে। তবে যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে, সেগুলো কার্যকর করা হলেও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক অধ্যাদেশের কয়েকটি রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালকের ভাষ্য, ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক শক্তির যোগসাজশে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য—জবাবদিহিমূলক ও দায়বদ্ধ সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল হলেও দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণের প্রবণতায় ‘এবার আমাদের পালা’ মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকার সংস্কারবিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারের বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও দুদক সংশোধন অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে আইন পাস করা হয়নি। এর পরিবর্তে ২০০৪ সালের আগের আইনে ফিরে যাওয়ায় কমিশনের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটানোর সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্নীতি দমনে কার্যকর ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আইন নিয়ে প্রশ্ন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ রহিত করে সম্প্রতি যে আইন পাস করা হয়েছে, সেটিও স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে মনে করে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, নতুন আইনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও অভিযোগ করেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে এমন একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ী হিসেবে অভিযুক্ত সংস্থাগুলো সুরক্ষা পেতে পারে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির কথা বলা হলেও নতুন নামে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাবান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। টিআইবির বক্তব্য অনুযায়ী, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাঠামো ও ক্ষমতা নিয়ে সংস্কারের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পুলিশ কমিশন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব কোথায়?
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও এ পর্যন্ত দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ এবং নিয়মিত হালনাগাদের বিধান নিয়েও মতৈক্য হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমান সংসদ সদস্যরা শপথ নেয়ার পর এ ধরনের নির্দেশনা বা চর্চার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
টিআইবির মতে, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, পুলিশি কার্যক্রমে স্বাধীন তদারকি এবং দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রসংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিহীন ক্ষমতাকাঠামো আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা কি ভুলে গেছে রাজনৈতিক দলগুলো?
কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির বাইরে রাখার কারণে দেশকে যে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে, তা এত অল্প সময়ের মধ্যে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে ভুলে গেলো—এমন প্রশ্ন তুলেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনসহ অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছিলো। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে সরকারি দলসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তখন ঐকমত্যে পৌঁছেছিলো।
কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগের প্রবণতায় ক্ষমতাসীন দল আগের অভিজ্ঞতার বিপরীত পথে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে বিরোধী জোটও রাষ্ট্রসংস্কারকে এগিয়ে নেয়ার পরিবর্তে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে।
টিআইবির বক্তব্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সবার দেশ/কেএম




























