১০ বছরের চুক্তি, বাড়তি সুরক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ
১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য জাপানের শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত নতুন সমঝোতা স্মারক (ইএসডিপি-এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার হবে।
চুক্তির মেয়াদ ১০ বছর
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকটি প্রায় এক বছরের প্রচেষ্টার পর চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাপানের পক্ষে দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষ হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়বে বলে জানানো হয়েছে। সে হিসাবে চুক্তিটির সম্ভাব্য মোট মেয়াদ হবে ১০ বছর।
প্রকাশিত ঘোষণা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরের সময় চুক্তির কপি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে।
কর্মীরা যেসব সুবিধা পেতে পারেন
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো বাংলাদেশি কর্মীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কর্মী পাঠানো ও গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানো।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি কর্মীরা যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা: জাপানি স্থানীয় কর্মীদের সমতুল্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ।
- দক্ষতা উন্নয়ন: জাপানে কাজের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ।
- উন্নত কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা: দক্ষতা ও কাজের ধরন অনুযায়ী ভালো বেতন এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবন গড়ার সুযোগ।
- নারী কর্মীদের সুরক্ষা: নারী-পুরুষের সমান কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মদানের কারণে বৈষম্য ও চাকরিচ্যুতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা।
- দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা: প্রযোজ্য অভিবাসন আইন ও ভিসার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জাপানে দীর্ঘমেয়াদে বসবাস ও কাজের সুযোগ।
তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, কোন শ্রেণির কর্মীরা এর আওতায় আসবেন এবং আবেদনকারীদের কী কী যোগ্যতা পূরণ করতে হবে, তা বিস্তারিত বাস্তবায়ন নির্দেশিকার ওপর নির্ভর করবে।
গর্ভাবস্থার কারণে চাকরিচ্যুতি নয়
নতুন চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারী বিদেশি কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার বিষয়টি। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদানের কারণে নারী কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা কিংবা তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না।
এ ধরনের কারণে নারী কর্মীদের জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর বাধ্যতামূলক বিধানও চুক্তিতে রাখা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে জাপানে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানে যেতে আগ্রহীদের প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত?
জাপানে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের এখন থেকেই ভাষা, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের বিষয়ে মনোযোগ দেয়া উচিত। তবে চুক্তির আওতায় নিয়োগের আনুষ্ঠানিক আবেদনপ্রক্রিয়া, পেশাভিত্তিক চাহিদা, ভাষাগত যোগ্যতা, বয়সসীমা, বেতন এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।
আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরামর্শ—
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করুন।
- জাপানি ভাষা শেখা এবং নিজের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিন।
- নিয়োগের আনুষ্ঠানিক নিয়ম প্রকাশের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কথায় বড় অঙ্কের টাকা জমা দেবেন না।
- চাকরির চুক্তিপত্র, বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন, বিমা এবং অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে লিখিত তথ্য যাচাই করুন।
- ভিসা, নিয়োগকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বৈধতা নিশ্চিত করে তবেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিন।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো। জাপানের মতো উন্নত অর্থনীতির দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশি কর্মীরা আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। একই সঙ্গে দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরই তাৎক্ষণিকভাবে সবার জন্য চাকরি নিশ্চিত করে না। নিয়োগের প্রকৃত সুযোগ নির্ভর করবে জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদা, নির্ধারিত যোগ্যতা, ভিসা ও অভিবাসন বিধান এবং আনুষ্ঠানিক নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর।
সবার দেশ/এমকেজে




























