ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহের তাণ্ডব, ৫৪ অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা
ফ্রান্সে গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু
অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে ইউরোপের একের পর এক দেশ। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যজুড়ে তীব্র গরমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে প্রচণ্ড গরমে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া তাপদাহ থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে নদী, হ্রদ ও বিভিন্ন জলাশয়ে নামার পর ডুবে মারা গেছেন আরও অন্তত ৪০ জন।
পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা দেশটির ৫৪টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশটি বর্তমানে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ফ্রান্সে ভাঙল রাতের তাপমাত্রার রেকর্ড
ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ১৯৪৭ সাল থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী গত সোমবার রাতে দেশটির ৩০টি আবহাওয়া কেন্দ্রের গড় তাপমাত্রা ছিলো ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি দেশটির ইতিহাসে রাতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই রাতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিলো ২১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলমান তাপপ্রবাহ সে রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, দেশের অধিকাংশ এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তিনি জনগণকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানান।
গরমে প্রাণহানি, পানিতে নেমেও মিলছে না রক্ষা
তীব্র গরমের কারণে মানুষ নদী, লেক ও বিভিন্ন জলাশয়ে ছুটে গেলেও সেখানেও ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেন, অননুমোদিত বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সাঁতার কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তাপপ্রবাহের সময় এসব স্থানে নামা প্রাণঘাতী হতে পারে।

দেশটির সিন নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় কার্পেনট্রাস শহরে রোদের তাপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা একটি পার্ক করা গাড়ির ভেতর থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে লিঁও শহরের কাছে রোন নদী থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা এক তরুণ ফুটবলার বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ইতালিতে রেড অ্যালার্ট, শ্রমিকদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালিতেও তাপপ্রবাহের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানী রোম, অর্থনৈতিক কেন্দ্র মিলানসহ দেশের ১৫টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।
অতিরিক্ত গরমে কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ইতালি সরকার জরুরি শ্রম সুরক্ষা আইন পুনরায় কার্যকর করেছে। এর আওতায় দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়গুলোতে বাইরে কাজ সীমিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জার্মানি ও স্পেনেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
জার্মানিতেও তাপপ্রবাহের কারণে একাধিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির রাইন নদী থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নামার সময় তারা দুর্ঘটনার শিকার হন।
স্পেনেও তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। সাধারণত তুলনামূলক শীতল হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চলের স্যান সেবাস্তিয়ান শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

স্পেনের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, গত দুই দশকে দেশটিতে তাপপ্রবাহের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে দেশটিতে ১০ বার বড় ধরনের তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, যেখানে এর আগের ২৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছিলো মাত্র দুবার।
যুক্তরাজ্যেও তাপমাত্রা ছুঁতে পারে ৩৯ ডিগ্রি
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদফতর সতর্ক করে জানিয়েছে, চার দিনের তাপপ্রবাহে দেশটির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দাবানলের আশঙ্কাও বেড়েছে।
তাপপ্রবাহের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান তাপপ্রবাহের পেছনে ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ আবহাওয়াগত পরিস্থিতি কাজ করছে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে সাহারা মরুভূমি থেকে অত্যন্ত উষ্ণ বায়ু ইউরোপের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু গবেষক ক্লেয়ার বার্নেসের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ, ঝড় ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে। বর্তমান পরিস্থিতি সে বৈশ্বিক প্রবণতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে চলমান এ তাপপ্রবাহ শুধু সাময়িক আবহাওয়াগত সংকট নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের একটি কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
সবার দেশ/কেএম




























