অতিরিক্ত সময়ে ভাঙলেঅ আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ
একতরফা খেলে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন
দীর্ঘ ১০৫ মিনিটের অপেক্ষার পর অবশেষে ভাঙল আর্জেন্টিনার রক্ষণ। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফেরান তোরেসের গোলে বিশ্বকাপ ফাইনালে এগিয়ে গেল স্পেন। পুরো ম্যাচজুড়ে দাপুটে ফুটবল খেলা লা রোজারা শেষ পর্যন্ত তাদের আধিপত্যের পুরস্কার পেলো, আর লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা পড়ল শিরোপাহীন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিলো স্পেনের হাতে। বলের দখল, পাসিং, আক্রমণ—প্রতিটি বিভাগেই আর্জেন্টিনাকে ছাপিয়ে যায় ইউরোপের দলটি। তবে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের কারণে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত গোলশূন্যই থাকে ম্যাচ।
ম্যাচের মাত্র পঞ্চম মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলো স্পেন। লামিন ইয়ামালের ক্রস ডিফ্লেক্ট হয়ে দানি ওলমোর কাছে গেলে তিনি আবার বল ফিরিয়ে দেন ইয়ামালের দিকে। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হন স্প্যানিশ তরুণ।
দুই মিনিট পরই আর্জেন্টিনার প্রথম বড় সুযোগটি নষ্ট করেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। দ্রুত লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে লিওনেল মেসিকে গোল করতে দেননি তিনি।
প্রথমার্ধে স্পেনের একচেটিয়া আধিপত্য ছিলো পরিসংখ্যানেও। বলের দখল ছিলো ৬৫ শতাংশ, যেখানে আর্জেন্টিনার মাত্র ৩৫ শতাংশ। নিখুঁত পাসে স্পেন এগিয়ে ছিলো ৩১৩-১৫৫ ব্যবধানে। প্রথম ৪৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা লক্ষ্যে তো দূরের কথা, কোনও শটই নিতে পারেনি। অন্যদিকে স্পেন বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে আক্রমণ চালালেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দুর্দান্ত সব সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
৩৯ মিনিটে ফাবিয়ান রুইজের পাস থেকে মিকেল ওয়ারজাবালের বাম পায়ের জোরালো শটও ঠেকিয়ে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। ৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। ইনজুরিতে পড়ে কিছুক্ষণ পর তাকে বদলি করা হয়।
দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের চিত্র বদলায়নি। বিরতির পর লিওনেল স্কালোনি কৌশলগত পরিবর্তন এনে নিকো গঞ্জালেজের বদলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামালেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
বরং ম্যাচে নেমেই পারেদেস রদ্রিকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন। এরপরও স্পেনের আক্রমণের ধার কমেনি। ৫৫ মিনিটে নিকোলাস ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকলে নিশ্চিত গোল থেকে বেঁচে যায় আর্জেন্টিনা। কয়েক মিনিট পর দানি ওলমোর ব্যাকপাস থেকে কুকুরেয়ার সামনে তৈরি হওয়া সুযোগও শেষ মুহূর্তে ক্লিয়ার করেন গঞ্জালো মন্তিয়েল।
৬২ মিনিটে স্পেন একসঙ্গে ফেরান তোরেস ও পেদ্রিকে মাঠে নামায়। বদলি খেলোয়াড়রাই পরে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন। এরপর ওলমো, পেদ্রি, ইয়ামাল, কুবার্সি—একাধিকবার আর্জেন্টিনার গোলমুখে আক্রমণ চালালেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বাঁচিয়ে রাখেন।
ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর কোনও ফাইনালে প্রথম ৭০ মিনিটে লক্ষ্যে শট নিতে না পারার নজির এটিই প্রথম।
নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। এরপরও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ সেভে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে একবার বল জালে পাঠিয়েছিলো স্পেন। নিকো উইলিয়ামসের সে গোলটি অবশ্য ভিএআর পর্যালোচনার পর বাতিল করেন রেফারি। মিকেল মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি স্বীকৃতি পায়নি।
তবে দ্বিতীয় অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আর কোনো ভুল করেনি স্পেন। ১০৬তম মিনিটে পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামস বল বাড়িয়ে দেন ফেরান তোরেসের কাছে। সুযোগ বুঝে ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল জড়িয়ে দেন আর্জেন্টিনার জালে। দীর্ঘ সময়ের অবিরাম আক্রমণের পর অবশেষে প্রাপ্য গোলটি পায় স্পেন।
বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করে বিশেষ কীর্তিও গড়েন ফেরান তোরেস। ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির মারিও গোটসের পর তিনিই প্রথম বদলি খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপ ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে গোল করে নিজের দলকে শিরোপার স্বাদ পেয়ে দিলেন।
সবার দেশ/কেএম




























