Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৫৭, ৩০ আগস্ট ২০২৬

গুম ঠেকাতে আইন, তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

গুম ঠেকাতে আইন, তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেছেন। বিলটি পাস হলে গুমকে পৃথকভাবে আইনি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি দোষীদের শাস্তি, ভুক্তভোগী ও পরিবারের আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে প্রস্তাবিত আইনটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মূল উদ্বেগ—গুমের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব একটি স্বাধীন ও পৃথক সংস্থার হাতে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনও বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি গুমের অভিযোগ ওঠে, তাহলে একই ধরনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্য কোনো বাহিনী দিয়ে তদন্ত করালে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।

গুমের অভিযোগের দীর্ঘ ইতিহাস

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম হওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ওই সময়ে গুমের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকার পতনের পর গুমের ঘটনাগুলো তদন্তে ২০২৫ সালে একটি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছর গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশও জারি করা হয়।

তবে পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় ওই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। এরপর নতুন করে যাচাই-বাছাই করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে আইন করার উদ্যোগ নেয় সরকার।

নতুন আইনে কী থাকছে

প্রস্তাবিত বিলে প্রথমবারের মতো গুমের একটি আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, কোনও সরকারি কর্মচারী, শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারের অনুমোদনে কাউকে গ্রেফতার, আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার করা কিংবা গোপন রাখাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আর গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছর পরও তার কোনও সন্ধান পাওয়া না গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

পরিকল্পিত ও ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য অধিকার

প্রস্তাবিত আইনে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকারও থাকবে। পাশাপাশি অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়েও বিধান রাখা হয়েছে।

তবে এসব অধিকার বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাধীন তদন্ত সংস্থা কেন নয়?

বিলটির সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষমতা দিয়ে যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিলো, নতুন বিলে সে কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবার তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, কোনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি গুমের অভিযোগ ওঠে, তাহলে অন্য কোনও বাহিনী দিয়ে তদন্ত করালে সেটি কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে?

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, তদন্তের দায়িত্ব পৃথক কোনও কমিশন অথবা বেসামরিক প্রশাসনের হাতে দেয়া উচিত।

তার মতে, একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনী তদন্ত করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্তে বাহিনীগুলোর বাইরে স্বাধীন তদন্ত কাঠামো থাকা প্রয়োজন।

বিশেষায়িত সংস্থার দাবি

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত একটি সংস্থা প্রয়োজন। সে সংস্থার নিজস্ব জনবল ও বাজেটের পাশাপাশি গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শন, নথি ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের কার্যকর ক্ষমতা থাকা দরকার।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানও গুমের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রাখার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

তার মতে, গুমের মতো ঘটনা তদন্তে বিশেষ কমিশন অথবা ইস্যুভিত্তিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

তবে তিনি মনে করেন, নতুন আইনের একটি ইতিবাচক দিক হলো—এর মাধ্যমে গুমের অভিযোগ জানানোর একটি সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।

বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ

তদন্তের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার কিছু বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।

তার মতে, গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার এবং প্রয়োজনগুলো আইনে আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষতিপূরণ ও পরিবারের অধিকার বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট বিধান দরকার।

তিনি মনে করেন, আসামির সম্পৃক্ততা অস্বীকার কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এমনভাবে রাখা হয়েছে, যাতে কোনও কোনও ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনে দ্রুত বিচার শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ ফৌজদারি মামলাই যেখানে বছরের পর বছর চলতে পারে, সেখানে গুমের মতো জটিল মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা, আলামত সংগ্রহ, ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।

তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা কতটা সম্ভব এবং সময়সীমা অতিক্রম করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাক্ষী সুরক্ষাও বড় প্রশ্ন

গুমের মামলায় সাক্ষী ও তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত আইনে তাদের নিরাপত্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে কে এবং কীভাবে এ সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অতীতে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি ও চাপের মুখে পড়ার অভিযোগও এসেছে। ফলে শুধু আইনে নিরাপত্তার বিধান রাখাই যথেষ্ট নয়; কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পৃথক কাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইন হলেই কি বদলাবে বাস্তবতা?

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন, ভুক্তভোগীদের তালিকা তৈরি, অধ্যাদেশ এবং এখন নতুন আইন করার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে গুমের ঘটনাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার একটি প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিলে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ, কঠোর শাস্তি, ভুক্তভোগী ও পরিবারের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের সুযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

তবে শেষ পর্যন্ত আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তদন্ত ও বিচার কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি স্বাধীনভাবে না হয়, তাহলে আইনে যত কঠোর শাস্তিই থাকুক, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।

তাই শুধু গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া নয়—অপরাধের তদন্ত, বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করাই হবে নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

সবার দেশ/এমকেজে

শীর্ষ সংবাদ:

গুম ঠেকাতে আইন, তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
নেপালে বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ৭৩৪, নিখোঁজ ২,৪৯৮
হাসনাতের বেলায় হুজুররা চেতেছে, বিএনপির বেলায় চুপ: মাদানী
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টে রিট
মেসির ‘হালি’তে মন্ট্রিয়ল ধ্বংস, ৭-১ গোলে মায়ামির তাণ্ডব
বিলাওয়ালের বিয়ের গুঞ্জন, পাত্রী ইউরোপের!
নেপাল-চীনে বন্যায় মৃত প্রায় ৭০০, নিখোঁজ ৩ হাজার
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ, হদিস নেই আড়াই শ মানুষের
গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
সংসদমুখী পদযাত্রায় ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান
মিরাজ নিখোঁজে ‘গুমের কাহিনী’ সাজানোর চেষ্টা হতে পারে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রংপুরে চার খুন হত্যায় সিদ্ধার্থের বাবা-ভাই ডিবি হেফাজতে
আ.লীগ ফেরার বাতাস শুধু ভারত-সোশ্যাল মিডিয়ায়: সারজিস
ঝুলন্ত সেতু পানিতে তলিয়ে চলাচল বন্ধ রাঙামাটিতে
পাকিস্তানে তুর্কি সামরিক বিমানের আনাগোনা, উদ্বিগ্ন ভারত
২৪ ঘণ্টায় বন্যার শঙ্কায় দুই জেলা
নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তৃতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা
গুমের প্রতিটি ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ও বিচার চান নাহিদ
কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশন
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ আসছে সেপ্টেম্বরে, থাকছে যেসব ফিচার