Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৫৪, ১২ মে ২০২৬

ইউনূস আমলেও টিকা ছিলো, আন্দোলনরত স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করেনি

ইউনূস আমলেও টিকা ছিলো, আন্দোলনরত স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করেনি
ছবি: সংগৃহীত

দেশে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়া হামে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৪১৫ জন। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে ৫৬ জেলায়। শিশু মৃত্যুর এ ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে— টিকার ঘাটতি ছিলো, নাকি ব্যর্থতা ছিলো ব্যবস্থাপনায়? দেশের এক জাতীয় দৈনিক ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হামের এমআর টিকার কোনও সংকট ছিলো না। এমনকি ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় টিকাও গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে এসে পৌঁছেছিলো। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা, জাতীয় নির্বাচন, টাইফয়েড ক্যাম্পেইন এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে সে টিকা সময়মতো শিশুদের শরীরে পৌঁছায়নি।

এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে, কোনও অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার কারণে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে কি না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারির পর টিকাদান কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন, টানা পাঁচ বছর জাতীয় হাম ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা, স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি এবং ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়াই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমআর টিকার কোনও ঘাটতি কখনও ছিলো না। প্রতি তিন মাস অন্তর চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জেলায় টিকা পাঠানো হয়েছে। অনেক জেলায় আগের টিকা অবশিষ্ট থাকায় নতুন করে কম চাহিদা আসে। এমনকি বর্তমানে চলমান ক্যাম্পেইনের টিকাও গত বছরের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় গুদামে পৌঁছে যায়।

কিন্তু টিকা হাতে এসেও শুরু হয়নি জাতীয় ক্যাম্পেইন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগে থেকেই নির্ধারিত টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচি, এরপর জাতীয় নির্বাচন এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে বারবার পিছিয়ে যায় হাম প্রতিরোধ ক্যাম্পেইন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময় দ্রুত ক্যাম্পেইন শুরু করা গেলে হয়তো দেশকে এত বড় প্রাদুর্ভাব দেখতে হতো না।

ইউনিসেফ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকার আওতায় না আসায় দেশে বড় ধরনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ায় অনেক অভিভাবকও শিশুদের নিয়মিত টিকা দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া আরও সহজ হয়ে যায়।

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধস

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। এতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে কাভারেজে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

২০২৩ সালের কভারেজ মূল্যায়ন সমীক্ষা অনুযায়ী, এমআর১ অর্থাৎ হামের প্রথম ডোজের কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৮৬ শতাংশে। আরও উদ্বেগজনকভাবে এমআর২ অর্থাৎ দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ৮৯ শতাংশ থেকে নেমে আসে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে।

এর অর্থ, প্রায় এক কোটি শিশু প্রথম ডোজ এবং প্রায় দুই কোটি শিশু দ্বিতীয় ডোজের পর্যাপ্ত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যদিও ইপিআইয়ের অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রুটিন টিকার কাভারেজ তুলনামূলক ভালো ছিলো। ২০২৪ সালে এমআর টিকার কভারেজ ছিলো ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটে।

ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে এমআর১ কভারেজ ছিলো ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং এমআর২ কভারেজ ছিলো ৯৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ এমআর১ কভারেজ নেমে আসে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশে এবং এমআর২ দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ এক মাসের ধসই সারাদেশে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে।

৬ বছর বন্ধ জাতীয় ক্যাম্পেইন

নিয়মিত টিকা কর্মসূচির বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে জাতীয় ক্যাম্পেইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশে সর্বশেষ হাম ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, যা শেষ হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে।

পরবর্তী ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিলো ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। পরে সেটি সেপ্টেম্বরে নেয়া হয়। কিন্তু টাইফয়েড ক্যাম্পেইনের কারণে তা পিছিয়ে ডিসেম্বর করা হয়। ডিসেম্বরজুড়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে তখনও ক্যাম্পেইন শুরু করা যায়নি। এরপর জাতীয় নির্বাচন চলে আসে। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ক্যাম্পেইন শুরু হলেও ততদিনে দেশজুড়ে হাম ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনে মুখ থুবড়ে পড়ে টিকাদান

দেশব্যাপী প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে কর্মরত ১৫ হাজারের বেশি স্বাস্থ্য সহকারী দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, নিয়োগবিধি সংশোধন এবং টেকনিক্যাল পদমর্যাদাসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন।

গত বছরের ২৫ মে বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করে। পরে জুলাইয়ে দেশব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। সর্বশেষ নভেম্বরের শেষ থেকে পুরো ডিসেম্বর মাসজুড়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সামনে লাগাতার কর্মসূচি পালন করেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা স্বীকার করেছেন, ডিসেম্বর মাসজুড়ে দেশের অধিকাংশ অস্থায়ী টিকাকেন্দ্রে কার্যক্রম বন্ধ ছিলো।

তিনি বলেন, আমরা ২৭ নভেম্বর থেকে আন্দোলন শুরু করি। ৩০ নভেম্বর থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। পুরো ডিসেম্বর মাস টিকা কার্যক্রম বন্ধ রেখে আন্দোলন করেছি। কিছু স্থায়ী কেন্দ্রে সীমিত টিকা দেয়া হলেও অধিকাংশ অস্থায়ী কেন্দ্রে কার্যক্রম বন্ধ ছিলো।

তিনি আরও বলেন, জুলাই থেকে তিন মাস আমরা টিকা কার্যক্রমের রিপোর্ট ইনপুট দিইনি। পরে সিভিল সার্জন অফিস টিকার ভায়াল ব্যবহারের ভিত্তিতে কাভারেজ সমন্বয় করে। এরপর আমরা আরও কঠোর আন্দোলনে যাই।

এ বিষয়ে ইপিআইয়ের তৎকালীন উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ইপিআই থেকে কখনও টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়নি। কিন্তু আন্দোলনের কারণে অস্থায়ী টিকাকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বড় গ্যাপ তৈরি হয়।

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বন্ধেও বেড়েছে মৃত্যু

রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর দুবার এ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। এরপর আর কোনও ক্যাম্পেইন হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ায় ভোগা শিশুদের শরীর দুর্বল থাকায় হাম মারাত্মক আকার নিয়েছে। সময়মতো ভিটামিন ‘এ’ দেয়া হলে অনেক শিশুর জীবন হয়তো বাঁচানো সম্ভব হতো।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, ২০২১ সালের পর জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় বড় ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। পরে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনে টিকাদান বন্ধ থাকায় খুব দ্রুত আউটব্রেক তৈরি হয়। সেপ্টেম্বরে আসা টিকা দিয়ে যদি তখনই ক্যাম্পেইন করা যেতো, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বিগত কয়েক বছরে অনেক শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে ছিলো। জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় সে সংখ্যা আরও বেড়েছে। ইতোমধ্যে আইইডিসিআর-কে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, টিকা হাতে রেখেও সময়মতো ক্যাম্পেইন না করা, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অব্যবস্থাপনাই আজকের ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই বলে দেবে— এ শত শত শিশুমৃত্যুর দায় শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে গিয়ে পড়ে।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ভারতের নিজস্ব বিষয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আইন ভেঙে এসআইবিএলের প্রশাসক বদলি
ইউনূস আমলেও টিকা ছিলো, আন্দোলনরত স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করেনি
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ছাত্রদল নেতারা আসনে, দাঁড়িয়ে শিক্ষকরা
সিগারেটের দাম বাড়িয়ে ১৭ থেকে ৩৫ টাকার প্রস্তাব
দুর্নীতি ও লুটপাট করলে ফ্যাসিস্ট সরকারের পরিণতি হবে: খায়রুল কবির
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ ৪ ছাত্রী, উৎকণ্ঠায় পরিবার
যুদ্ধবিরতি লাইফ সাপোর্টে, বাঁচার সম্ভাবনা ১ শতাংশ: ট্রাম্প
নবীনগরে র‍্যাব সদস্যদের ওপর হামলা, মারধর
বীরগঞ্জে তিন মাদক কারবারি গ্রেফতার, থানায় দুই মামলা
লুটপাটকারীরা আর ব্যাংক খাতে ফিরতে পারবে না: গভর্নর
২ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার কারণ জানালো বিএসএফ
মেলান্দহে চেক জালিয়াতির দায়ে জামায়াত নেতা জেলহাজতে
কাপুরুষের সমাজে নাসির আমার বীরপুরুষ: তামিমা
মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব
‘১৮ বছর বঞ্চিত থেকেও জাতীয়তাবাদী আদর্শ বদলাইনি’
নাভারন-সাতক্ষীরা মহাসড়কে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় নিহত ২