জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করা ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর সম্মাননা দিতে যাচ্ছে জাতিসংঘ। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অসামান্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেয়া হবে জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ‘দাগ হ্যামারশোল্ড পদক’।
আগামী ৫ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিহত শান্তিরক্ষীদের পরিবারের প্রতিনিধিদের কাছে এ সম্মাননা তুলে দেবেন।
জাতিসংঘের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালনকালে নিহত শান্তিরক্ষীদের স্মরণ করা হবে। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ছয় বীর শান্তিরক্ষীকেও মরণোত্তর সম্মান জানানো হচ্ছে।
পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হলেন— মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. সবুজ মিয়া, মো. মাসুদ রানা, মো. মোমিনুল ইসলাম, শামীম রেজা এবং সান্ত মণ্ডল।
তারা ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর আফ্রিকার বিরোধপূর্ণ অঞ্চল আবেইতে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ)-তে দায়িত্ব পালনকালে এক ড্রোন হামলায় নিহত হন। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের এ আত্মত্যাগ বাংলাদেশকে যেমন গর্বিত করেছে, তেমনি বিশ্ব শান্তিরক্ষার ইতিহাসেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো প্রায় সাড়ে চার হাজার শান্তিরক্ষীর স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
এ বছর শুধু বাংলাদেশের ছয় সদস্যই নন, গত বছর নিহত ৫৯ জনসহ মোট ৬৮ জন সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক শান্তিরক্ষীকেও মরণোত্তর ‘দাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ প্রদান করা হবে।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সামরিক ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অবদানকারী দেশ। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে বাংলাদেশের চার হাজারের বেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন, যাদের মধ্যে ২৭৭ জন নারী সদস্যও রয়েছেন।
বর্তমানে আবেই, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, সাইপ্রাস, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, লেবানন, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান ও পশ্চিম সাহারায়-সহ বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ৫০ হাজারেরও বেশি সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক শান্তিরক্ষী কাজ করছেন। বিশ্বের ১১৮টি দেশ বর্তমানে ১১টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে জনবল সরবরাহ করছে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০২ সালে ২৯ মে-কে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৪৮ সালে প্রথম শান্তিরক্ষা মিশন ‘ইউনাইটেড নেশনস ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠার স্মরণে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিলো ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’। প্রতিপাদ্যে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে টেকসই রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেয়া বাণীতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অতীত ও বর্তমানের সব শান্তিরক্ষীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, শান্তিরক্ষা স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও আশার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি পরীক্ষিত এবং সাশ্রয়ী উপায়। তবে এর সফলতার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন।
অন্যদিকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন ও অনিশ্চিত পরিবেশেও শান্তিরক্ষীরা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিচ্ছেন, সহিংসতা প্রতিরোধ করছেন এবং মানুষের মধ্যে আশার আলো জাগিয়ে রাখছেন।
তিনি বলেন, শান্তিরক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু নিরাপত্তায় নয়, বরং স্থিতিশীলতা, সংঘাত প্রতিরোধ এবং একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করা।
অনুষ্ঠানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের জন্য আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ক্যাপ্টেন এমবায়ে দিয়াগনে মেডেল ফর এক্সেপশনাল কারেজ’, ‘মিলিটারি জেন্ডার অ্যাডভোকেট অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ইউএন উইমেন পুলিশ অফিসার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’।
বাংলাদেশের ছয় শান্তিরক্ষীর এ মরণোত্তর সম্মাননা শুধু তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদান ও সুনামেরও এক গৌরবময় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























