ডারউইনে টাইগারদের মহাকাব্যিক টেস্ট জয়
অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে ইতিহাস লিখলো বাংলাদেশ
ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশ আবারও লিখলো এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। একসময় ২০০৫ সালে কার্ডিফে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে যে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিলো বাংলাদেশ, দুই দশক পর সে অস্ট্রেলিয়ারই মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে আরও বড় এক কীর্তি গড়লো টাইগাররা।
ডারউইনে চার দিনের মধ্যেই স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম নতুন করে লিখিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। জয়ের জন্য শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিলো মাত্র ৫৭ রান। সে লক্ষ্য অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলে টাইগাররা, হারায় কেবল একটি উইকেট।
এটি শুধু একটি জয় নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক।
প্রথম দিনেই অজি ব্যাটিং লাইনআপে ধস
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিলো বাংলাদেশের দাপট। প্রথম দিনেই টাইগার পেসারদের আগুনঝরা বোলিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ।
নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৯৮ রানেই গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের বোলারদের এমন নিয়ন্ত্রিত ও আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স ম্যাচের গতিপথ প্রথম দিনেই বদলে দেয়।
অজিদের সে সংগ্রামের জবাবে ব্যাট হাতে বাংলাদেশ দেখায় অসাধারণ ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস।
তানজিদের সেঞ্চুরি, শান্ত-মুমিনুলের লড়াই
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের নায়ক ছিলেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে বাংলাদেশের ইনিংসের ভিত গড়ে দেন।
তার পাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক। দুজনের লড়াকু অর্ধশতক বাংলাদেশের ইনিংসকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়।

শেষ দিকে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। সব মিলিয়ে ১৩৮ ওভার ব্যাট করে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৪২৬ রানের বিশাল স্কোর।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেয়ে ২২৮ রানের লিড নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় বাংলাদেশ।
সাড়ে সাত বছরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী কোনও দলের এত দীর্ঘ সময় ব্যাট করার ঘটনা বাংলাদেশের এ ইনিংসকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের স্পিন জাদু
২২৮ রানের বিশাল ঘাটতি নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া শুরু থেকেই চাপে ছিলো। চতুর্থ দিনের শুরুতে তাদের সংগ্রহ ছিলো ৪ উইকেটে ১৬১ রান।
কিছুটা প্রতিরোধের সম্ভাবনা তৈরি হলেও সকালে বল হাতে বাংলাদেশের হয়ে ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
প্রথমে অ্যালেক্স ক্যারিকে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ বানান তিনি। এরপর দ্রুত সাজঘরে ফেরান বেউ ওয়েবস্টার ও অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে।
এক প্রান্তে যখন উইকেট পতনের মিছিল, তখন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একাই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ক্যামেরন গ্রিন।
ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরি, তবু রক্ষা হয়নি অস্ট্রেলিয়ার
বাংলাদেশি বোলারদের সামনে দীর্ঘ সময় লড়াই করে ক্যামেরন গ্রিন ১৯২ বলে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। ঘরের মাঠে এটি ছিলো তার প্রথম টেস্ট শতক।
১০৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার লড়াইকে কিছুটা দীর্ঘায়িত করলেও দলের পরাজয় ঠেকাতে পারেননি।
নতুন স্পেলে ফিরে গ্রিনকেই বোল্ড করেন পেসার হাসান মাহমুদ। ম্যাচে এটি ছিলো তার নবম উইকেট।
অন্যদিকে নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৫তম পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে।
বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য, তারপর ডারউইনের মহাকাব্য
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই তানজিদ হাসান তামিমের উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তবে এরপর আর কোনও নাটক হতে দেননি দুই বাঁহাতি ব্যাটার মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম।
দুজনই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় অস্ট্রেলিয়ার বোলিং মোকাবিলা করেন এবং ধীরে ধীরে জয়কে সময়ের ব্যাপারে পরিণত করেন।
শেষ পর্যন্ত মুমিনুল হকের ব্যাট থেকে আসা দুর্দান্ত এক স্কয়ার কাট বাউন্ডারিতেই নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়।
মুমিনুল অপরাজিত থাকেন ৩৯ বলে ৩০ রানে। অন্য প্রান্তে ৪২ বলে ২৫ রানে অপরাজিত ছিলেন সাদমান ইসলাম।
চার দিনের মধ্যেই ৯ উইকেটের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
কার্ডিফ থেকে ডারউইন—দুই দশকের বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
২০০৫ সালের কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দিয়েছিলো। তখন অনেকের কাছে সেটি ছিলো এক অবিশ্বাস্য অঘটন।
কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটও।
ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানোর পর এবার তাদের নিজেদের মাটিতে গিয়ে অভিজাত টেস্ট ক্রিকেটে এমন দাপুটে জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের নতুন প্রমাণ।
এটি আর কোনও আকস্মিক চমক নয়—এটি একটি দলের পরিণত হওয়ার গল্প।
ব্যাট হাতে দীর্ঘ ইনিংস, পেসারদের ধারালো বোলিং, স্পিনারদের নিয়ন্ত্রণ এবং চাপের মুহূর্তে ব্যাটারদের দায়িত্বশীলতা—এ জয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রায় সব শক্তিরই দেখা মিলেছে।
ডারউইনের এ জয় তাই শুধু একটি ম্যাচ জয়ের আনন্দ নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন বার্তা।
কার্ডিফে বাংলাদেশ বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলো। ডারউইনে বাংলাদেশ বিশ্বকে জানিয়ে দিলো—তারা এখন বড় মঞ্চে বড় প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য রাখে।
আর সে কারণেই ডারউইনের এ চার দিন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে, ইতিহাসের নতুন পাতা খুললো বাংলাদেশ।
সবার দেশ/কেএম




























