কমিশন নেই সাড়ে পাঁচ মাস
দুদককে অকার্যকর করে রেখেছে সরকার
সাড়ে পাঁচ মাস ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘কমিশন’ শূন্য রয়েছে। ফলে দুর্নীতির অভিযোগে নতুন মামলা দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল এবং অভিযুক্তদের অর্থ-সম্পদ ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় কমিশন না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমও ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মার্চ থেকে কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ শূন্য রয়েছে। ওই দিন তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে কমিশনের তিনটি পদই শূন্য।
কমিশন না থাকায় দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা দায়ের ও তদন্তসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রতিবেদন নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শেষে মামলা করার সুপারিশ করে শত শত প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। কিন্তু কমিশনের অনুমোদন না থাকায় এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নতুন মামলা দায়ের করা যাচ্ছে না। একইভাবে, অনেক মামলার তদন্ত শেষ হলেও কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে একদিকে নতুন দুর্নীতির মামলা দায়েরের গতি কমে গেছে, অন্যদিকে চলমান মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করার পরও সেগুলো আদালতে নেয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্পদ ক্রোক-অবরুদ্ধেও জটিলতা
কমিশন না থাকার কারণে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া না গেলে অভিযুক্তরা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হলে পরবর্তী সময়ে তা শনাক্ত ও উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান কার্যক্রমকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের পাশাপাশি সম্পদ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কমিশন না থাকায় প্রয়োজনীয় অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। এতে কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা
দীর্ঘ সময় ধরে কমিশন না থাকায় দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় কমিশন শূন্য থাকার নজির খুবই বিরল।
দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিনই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানতে চান নতুন কমিশন কবে গঠিত হবে। কিন্তু কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট কোনও সময়সীমা জানা নেই।
তিনি বলেন, কমিশন না থাকায় কর্মকর্তাদের অনেক কাজ করেও শেষ পর্যায়ের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনুসন্ধান ও তদন্তের সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ছয়জনের নাম পাঠানোর অপেক্ষা
দুদকের তিন সদস্যের নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। গত ২২ জুন সরকার পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করে। এ কমিটির কাজ হলো যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ছয়জনের নাম বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠানো।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে প্রধান করে গঠিত বাছাই কমিটিতে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্যবিদায়ী সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান রয়েছেন।
তবে কমিটি গঠনের দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও রাষ্ট্রপতির কাছে ছয়জনের নামের সুপারিশ পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে।
এ কারণে বাছাই কমিটি কবে ছয়জনের নাম চূড়ান্ত করবে, রাষ্ট্রপতি কবে তাদের মধ্য থেকে তিনজনকে অনুমোদন দেবেন এবং নতুন কমিশন কবে দায়িত্ব নেবে—এসব বিষয় এখনও অনিশ্চিত।
দুদকের কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা
দুদকের মতো সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাঠামো দীর্ঘ সময় শূন্য থাকায় দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নতুন মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র অনুমোদন এবং অভিযুক্তদের সম্পদ সুরক্ষায় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, দ্রুত নতুন কমিশন গঠন না হলে জমে থাকা অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজ আরও বাড়বে। পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ সরিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে সেগুলো উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
গত ৩ মার্চ তিন কমিশনারের একযোগে পদত্যাগের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সাড়ে পাঁচ মাসেও তা পূরণ না হওয়ায় এখন নতুন কমিশন গঠনের দিকেই তাকিয়ে আছেন দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টরা।
সবার দেশ/কেএম




























