লুটেরার রাজত্বে নীরব প্রশাসন
নদী হারাচ্ছে প্রাণ, দস্যুরা দখলে নিচ্ছে চরাঞ্চল
একসময় যে নদী ছিলো জনপদের প্রাণ, কৃষির স্বস্তি, জীবিকার অবলম্বন—আজ সে মেঘনা নদী মৃতপ্রায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক সে নদী এখন বালু দস্যুদের কবলে। নদী গর্ভে চলছে নির্বিচার বালু উত্তোলন। অথচ, প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে!
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের নলচর, রামপ্রসাদের চর, বাগ বাজার—এলাকা জুড়ে গভীর রাতে ৮টি ড্রেজার মেশিনে চলছে বালু তুলে নেয়ার মহোৎসব। সোমবার (৫ মে) রাত থেকে ফের শুরু হয় এ গোপন কার্যক্রম। দিনের আলোয় দেখা না গেলেও, রাত গভীর হলে নদীর বুক কাঁপে অবৈধ মেশিনের গর্জনে। এলাকাবাসী আতঙ্কিত। তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে এ নদী একদিন বিলীন হয়ে যাবে।
নদী হারাচ্ছে গতি, চর যাচ্ছে দখলে
এলাকাবাসীর ভাষায়, ‘নদীকে যেন গিলে খাচ্ছে এ দস্যুরা’। রাতের আধারে তারা শুধু বালু তুলছে না, অন্যপাশে জেগে ওঠা চরাঞ্চলও দখলে নিচ্ছে, গড়ে তুলছে আধিপত্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, বালু উত্তোলনের নাম করে সশস্ত্র চক্র এখন পুরো চর দখলে নিচ্ছে। রামপ্রসাদের চর, নলচর, পুরানগাঁও এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু নদীর পরিবেশ নয়, সামাজিক স্থিতিও ধ্বংস করছে। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি ও গুরুতর অপরাধের একাধিক মামলা।
প্রশাসনের ‘নীরব আশীর্বাদ’?
বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ স্পষ্টভাবে বলছে, অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলন অবৈধ। ৮ ধারা অনুযায়ী ড্রেজার বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রয়েছে প্রশাসনের। কিন্তু মাঠে নেই কোনও দৃশ্যমান তৎপরতা। নৌ পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও থানা প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যজনকভাবে নিরব।
থানা পুলিশ যখন দর্শকের ভূমিকায়, তখন বালু দস্যুরা ঘুরে বেড়ায় থানার আশপাশেই। কেবল এপ্রিল মাসেই নৌ পুলিশ চারটি অভিযানে বেশ কয়েকটি ড্রেজার ও নৌযান জব্দ করলেও থানা প্রশাসনের সহায়তা মেলেনি। আইন কী তবে শুধু কাগজেই?
দস্যুদের তালিকা স্থানীয়দের মুখে
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অপরাধচক্রে জড়িত রয়েছে পরিচিত কিছু নাম— নলচরের রবিউল্লাহ রবি, ইব্রাহিম, আশরাফুল, সবুজ, সানাউল্লাহ সরকার ও তার সহযোগী গং, পাগাড়িপাড়ার যুবদল সভাপতি দুলাল, ওয়াশিম, শাহ আলী, সফিক, দেলোয়ার, পুরানগাঁওয়ের সফিক, ফয়সাল, ফাইম এবং ফরাজিকান্দির আব্দুল গাফফার। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তাদের মধ্যে অনেকরেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তথ্য থাকলেও প্রশাসন অজানা কারণে তাদের স্পর্শ করছে না।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
মেঘনা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, আমার কাছে তথ্য এসেছে। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে ঠিক কবে, কীভাবে—সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৯ ধারায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে চুরি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একই আইনের ১৪৩ ধারায় বেআইনি সমাবেশ ও সশস্ত্র সংঘবদ্ধতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবুও প্রশাসন এসব আইন প্রয়োগ করছে না। পুলিশ আইন ১৮৬১ অনুযায়ী, অপরাধ প্রতিরোধে ওসির দায়িত্ব রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসক (ডিসি)-ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালু উত্তোলন ঠেকাতে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন।
আইনের প্রেক্ষিতে, বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১০ ধারায় বলা আছে, অনুমোদিত সংস্থা ছাড়া কেউ বালু উত্তোলন বা মজুত করতে পারবে না। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এখানকার বাস্তবতা বলছে, প্রশাসন যেন এ চক্রের ছায়াতলে।
‘রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া সম্ভব নয়’—এলাকাবাসী
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন চাইলে এ চক্র এক রাতেই থেমে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, রাজনৈতিক অনুকম্পা বা সরাসরি প্রশ্রয় ছাড়া প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কেউ দিনের পর দিন বালু তুলতে পারে না।
তাদের ভাষায়, নেতারা জনসেবার কথা বলেন, সভা-মিছিলে নদী রক্ষার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু মাঠে দেখা যায় উল্টো চিত্র। কখনও কোন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে টিকতে পারে না প্রশাসন, আবার কখনও প্রশাসনই চুপচাপ সরে দাঁড়ায়।
নদী শুধু পানির ধারা নয়, এ দেশের প্রাণ। আইন প্রয়োগে প্রশাসনের ব্যর্থতা মানেই দস্যুদের উৎসাহ দেয়া। এখনই সময় জবাবদিহিতার। না হলে নদী হারাবে প্রাণ, জনপদ হারাবে ভূমি, আর প্রশাসন হারাবে জনবিশ্বাস।
সবার দেশ/কেএম




























