বিসিবি দখলের রাজনীতি: প্রতিষ্ঠান না দলীয় সম্পত্তি?
বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই এক জটিল বাস্তবতার মধ্যে আবদ্ধ। ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে যায় প্রায় অপরিবর্তিত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এ দীর্ঘদিনের রোগকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে—আরও নগ্ন, আরও স্পষ্টভাবে।
অভিযোগ উঠেছে, দেশের স্বায়ত্তশাসিত ক্রীড়া সংস্থা বিসিবির নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দিয়ে সেখানে দলীয় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। শুধু প্রভাব বিস্তার নয়, বরং সরাসরি ‘দখল’—এমন ভাষাও ব্যবহার করছেন অনেকে। বলা হচ্ছে, বোর্ডে বসানো হয়েছে দলীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের, যাদের অনেকেই ক্রীড়া প্রশাসনে অভিজ্ঞ নন; বরং তারা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী পরিবারের সদস্য—মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালী নেতাদের স্ত্রী-পুত্র।
এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে: বিসিবি কি একটি পেশাদার ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি একটি রাজনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্র?
বিসিবির সংবিধান অনুযায়ী, বোর্ড পরিচালনায় যুক্ত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকা প্রয়োজন। কারণ ক্রিকেট আজ শুধু খেলা নয়, এটি অর্থনীতি, কূটনীতি ও জাতীয় ভাবমূর্তির একটি বড় অংশ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা International Cricket Council (আইসিসি) বারবারই জোর দিয়ে বলেছে—সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ড হতে হবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত এবং স্বায়ত্তশাসিত।
এ প্রেক্ষাপটে, যদি কোনও সরকার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বোর্ড পুনর্গঠন করে, তাহলে সেটি কেবল অভ্যন্তরীণ বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশ্ন তোলে। অতীতে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আইসিসি কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে—স্থগিত করেছে সদস্যপদ, বাতিল করেছে আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ফলে বিষয়টি কেবল ক্ষমতার নয়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে, যদি সত্যিই এমন ব্যক্তিদের বোর্ডে আনা হয়ে থাকে যারা ক্রীড়াবিষয়ক অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে, তাহলে সেটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনা মানে কেবল প্রশাসনিক পদ দখল নয়; এটি খেলোয়াড় উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি জটিল সমন্বয়।
এ অভিযোগের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—দলীয় ত্যাগী কর্মীদের বঞ্চনার প্রশ্ন। রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন ধরে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, যারা দমন-পীড়নের মুখে থেকেও দলীয় আদর্শে অটল থেকেছেন—তাদের অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে তারা কোথায়?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ত্যাগ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা। বহু নেতাকর্মী বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু যখন ক্ষমতার ফল ভোগের সময় আসে, তখন প্রায়ই দেখা যায়—সে জায়গাগুলো দখল করে নেন প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা, যারা হয়তো আন্দোলনের সময় দৃশ্যমান ছিলেন না।
এ বৈপরীত্য শুধু নৈতিক সংকট তৈরি করে না; এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও অসন্তোষ ও বিভাজনের জন্ম দেয়। তৃণমূলের ক্ষোভ যদি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, তাহলে তা একসময় বড় রাজনৈতিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে—যা সরকার বা দল উভয়ের জন্যই ‘বুমেরাং’ হতে পারে।
বিষয়টি নতুন নয়। অতীতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সে সময়েই প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ একটি কাঠামোগত রূপ পায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচকদের বক্তব্য—এখন সেটি আরও একধাপ এগিয়ে গেছে, যেখানে নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়: রাষ্ট্র কি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়, নাকি শক্তিশালী, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়?
বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে দেখা যায়, ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে সচেতনভাবেই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা হয়। কারণ খেলাধুলা মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত, এবং এখানে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সেখানে কেবল দক্ষতাকে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরও পড়ুন <<>> ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার সময়ের দাবি
বিসিবির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যদি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার, আন্তর্জাতিক সিরিজ, স্পনসরশিপ—সবকিছুই এতে প্রভাবিত হতে পারে।
এছাড়া বোর্ডের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি বোর্ডের ভেতরে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, বা নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে সেটি মাঠের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। ক্রিকেটারদের মনোবল, কোচিং কাঠামো, নির্বাচন প্রক্রিয়া—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত।
শোনা যাচ্ছে, বিসিবির নির্বাচিত সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইতোমধ্যে আইসিসির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ কোনও দেশের ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার হস্তক্ষেপ চাওয়া মানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত—বিশ্বাস পুনর্গঠন। যদি সত্যিই কোনও অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা উচিত। আর যদি অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত হয়, তাহলেও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা প্রয়োজন।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু সেটিই শুদ্ধির পথ। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে তাকে স্বাধীনতা দিতে হয়, এবং সে স্বাধীনতার প্রতি আস্থা রাখতে হয়।
সবশেষে, একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না—বাংলাদেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা দেখছে, বিশ্লেষণ করছে, প্রশ্ন তুলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা: শুধুমাত্র ক্ষমতা ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়; সে ক্ষমতার ব্যবহার কেমন হচ্ছে, সেটিও এখন বিচারাধীন।
যদি দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করবে না; বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর আস্থার সংকট তৈরি করবে। আর সে সংকট একসময় এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে কোনও ব্যাখ্যাই আর যথেষ্ট হবে না।
বিসিবি আজ একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র—শুধু ক্রিকেটের জন্য নয়, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যতের জন্যও। এখানে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোই বলে দেবে, আমরা কোন পথে এগোচ্ছি: শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ার পথে, নাকি দলীয় নিয়ন্ত্রণের পুরনো চক্রেই আবদ্ধ হয়ে থাকছি।
সম্পাদক
১০ এপ্রিল ২০২৬




























